Bookmark and Share
Home বাংলাদেশ বাংলাদেশে নির্বাচনঃ সংঘাত বাড়বে কি রাজনীতিতে?

eBook Collection

সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশে নির্বাচনঃ সংঘাত বাড়বে কি রাজনীতিতে? Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 22 November 2008 00:00
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পৌছেছে যে দেশটিতে নির্বাচন হলেও বিপদ না হলেও বিপদ। আর এটি দুর্বৃত্ত-কবলিত রাজনীতির ফসল। নির্বাচনের অর্থ শুধু ভোটগ্রহন বা ভোটগণনা নয়।কোন প্রার্থীকে বিজয়ী রূপে ঘোষণা দেওয়াও নয়। এগুলি তো প্রক্রিয়া মাত্র। নির্বাচন কতটা সফল হল সেটি নির্ভর করে লক্ষ্য অর্জনে সেটি সফল হল কিনা। আদালতে বিচারের লক্ষ্য এ নয় যে একটি বিচার বসবে এবং একটি রায় ঘোষিত হবে।বরং সে লক্ষটি হল, দোষীকে শাস্তি দেওয়া। কিন্তু বিচারের নামে যদি নির্দোষ ব্যক্তিকে জেলে পাঠানো হয়,আর পুরস্কৃত করা হয় অপরাধীদেরকে তবে সে বিচারে তো মহা-অকল্যাণ।তখন দেশ জুড়ে শত শত কোটকাছারি খুলে বিচার বসানোর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হল সে বিচারপদ্ধতির ত্রুটিগুলো সংশোধন করা। নইলে যতই বিচার বসবে ততই নির্দোষ ব্যক্তিরা শাস্তি পেতে থাকবে। আর পুরস্কৃত হবে দুর্বৃত্তরা।

নির্বাচনের মূল লক্ষ্য,সবচেয়ে সৎ ও যোগ্যবানদের নির্বাচিত করা এবং দুর্বৃত্তদের ক্ষমতা দখল থেকে রুখা। নির্বাচনের সফলতা ও বিফলতা যাচাই হতে হবে নূণ্যতম এ মানদন্ডে। বাংলাদেশে নির্বাচন বহুবার হয়েছে। কিন্তু সেসব নির্বাচনের সফলতা কতটুকু? ব্যর্থতা যে শুধু দূর্নীতিমূক্ত নির্বাচনী পদ্ধতি গড়ে তোলায় –তা নয়।সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল দুর্বৃত্তদের পরাজিত করার ক্ষেত্রটিতে। যতবারই নির্বাচন হয়েছে ততবারই বিজয়ী হয়েছে সমাজের সবচেয়ে অপরাধপ্রবন মানুষেরা। তাদের হাতে ব্যাপক ভাবে বেড়েছে দূর্নীতির চর্চা। ফলে দেশ একবার নয়, দুর্নীতিতে বিশ্বে পাঁচবার প্রথম হয়েছে।

অচিরেই বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কিন্তু এ নির্বাচনের ফলাফল কি দেশের জন্য কল্যাণকর হবে? সমাজে কি শান্তি নেমে আসবে? এখন বিবাদ বেধেছে কিভাবে নির্বাচন হবে তা নিয়ে। প্রশ্ন হল, নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা কি এতটাই কঠিন কাজ? বিশ্বের বহু ক্ষুদ্রদেশেও নিয়মিত নির্বাচন হয়। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরও হয়। কোন দেশেই নির্বাচন এত উদ্বেগ, এত সংশয় ও এত সহিংসা নিয়ে হাজির হয় না। এত বিবাদেরও সৃষ্টি হয় না। অথচ বাংলাদেশে নির্বাচন আসলেই বাড়ে উত্তেজনা, বাড়ে অস্থিরতা ও সংঘাত। দেশটি পিছিয়ে যাচ্ছে শুধু শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতির ক্ষেত্রে নয়, নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। অথচ আজ থেকে ৫০ বছর আগেও দেশে এতটা দুরবস্থা ছিল না। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নূরুল আমীন সরকার যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেছিল তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনরূপ বিতর্ক হয়নি। সে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যাচাইয়ে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সার্টিফিকেটেরও প্রয়োজন পড়েনি। এমন কি বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও সেনাবাহিনী মোতায়েন ও বিদেশী পর্যবেক্ষক নিয়োগের দাবীও উঠেনি। অথচ সে সময় দেশে এত শিক্ষিত লোক ছিল না। এত পুলিশ ও এত বিশাল সংখ্যক সরকারি আমলা ছিল না। প্রশাসনের হাতে এত ওয়্যারলেস টেলিফোন,হেলিকপ্টার ও গাড়ির বহর ছিল না। প্রশ্ন হল, ৫০ বছর পর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি কতটুকু? বাস্তবতা কি এই নয় যে এ ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়েছে অতি দ্রুততার সাথে? শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান এখন অকল্পনীয়। সংঘাত ঠেকাতে গ্রামেগঞ্জে এখন আর শুধু পুলিশ নামালে চলে না,হাজার হাজার সৈন্যও নামাতে হয়। নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচনী কমিশন বা প্রশাসন যে নিরপেক্ষ হবে সেটি কেউ ভাবতেও পারে না। দুর্বৃত্তদের হাত থেকে তারা কি নির্বাচন বাঁচাবে? বরং তাদের দুর্বৃত্তি থেকে নির্বাচন বাঁচাতে ঘাড়ের উপর বিদেশী পর্যবেক্ষক বসাতে হয়। নিজেদের বিবাদ ঠেকাতে যে পরিবারটি অন্য গ্রামের লোকদের হাতে পায়ে ধরে তাদের কি ইজ্জত থাকে? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে।পর্যবেক্ষক ডেকে আনতে হচ্ছে সূদুর ইউরোপ-আমেরিকা থেকে। হয়ত সেদিন আর দূরে নয়, বিবাদ থামাতে মানুষ নিজেদের পুলিশ ও সেনাবাহিনীকেও আর বিশ্বাস করবে না। কসোভো, কঙ্গো, সিয়েরালিওনের ন্যায় বাংলাদেশেও তখন জাতিসংঘ-বাহিনীর ডাক পড়বে।

 

এ ব্যর্থতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির। রাজনৈতিক দলগুলির যে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের নূণ্যতম সামর্থ বা যোগ্যতা আছে সেটি এখন আর কেউ বিশ্বাস করেনা। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও নয়। সে ব্যর্থতার সাক্ষী তারা নিজেরাই। নিজেদের সে অক্ষমতা মেনে নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়ভার চাপিয়েছে অস্থায়ী কেয়ারটেকার সরকারের উপর। এখন সমস্যা বেধেছে সে কেয়ারটেকার সরকার নিয়েও। তাদের বিরুদ্ধেও একইরূপ স্বৈরাচার,দুর্বৃত্তি, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। আর সেটি স্বাভাবিকও। কারণ তারা তো আসমান থেকে নামেননি, বরং ফসল তো একই ক্ষেতের। ফলে অনুরূপ অক্ষমতা, অযোগ্যতা ও পক্ষপাতিত্ব তাদের যে থাকবে না সেটি কি আশা করা যায়? তারা তো বেড়ে উঠেছে একই রূপ সেকুলার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জীবনবোধের পরিচর্যা নিয়ে। ফলে তাদের নাই পরকালের জবাবদিহীতার চেতনা। নাই চরিত্রে বিপ্লব আনার মত পরকালের ভয়ের বৈপ্লবিক দর্শন। রাজনৈতিক নেতাদের তবুও জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার ভয় থাকে, ভীতি থাকে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়ানোর।কিন্তু নির্বাচিত না হওয়ার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সে ভয়ের বালাই নাই। তাদের গলার রশিটি তাই সীমাহীন ঢিলা। ফলে সুযোগ থাকে সীমাহীন স্বৈরাচারি হওয়ার। তাছাড়া তাদের বাড়তি সুবিধা হল,তারা যত দুর্বৃত্ত, অযোগ্য ও পক্ষপাতদুষ্টই হোক সেটির বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোর নৈতিক বল রাজনৈতিক নেতাদের নেই। যে দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতাগণ নিজেরা পালন করতে পারেনি সেটি অন্যরা তাদের জন্য করে দিবে, সেটিই বা তারা আশা করে কি করে? আর এভাবে নির্বাচন নিয়ে দিন দিন সংকট ঘনিভূত হচ্ছে বাংলাদেশে। রোগ চলে যাচ্ছে নিরাময়ের বাইরে।অবস্থা দাঁড়িয়েছে এমন, এ সংকট থেকে বেরুবার রাস্তাও নেই। একটি দেশ তো এভাবেই ব্যর্থ-রাষ্ট্রে পরিণত হয়।তখন বিদেশীদের হাতে পায়ে ধরা এমন জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। দেশ এভাবেই যায় শত্রুর দখলে। ১৯৭১-এ এ কারণেই ভারতকে ডেকে আনা হয়েছিল। আফগানিস্তানেও মার্কিনরা এসেছে তেমন এক প্রেক্ষাপটে। তেমনি এক বিদেশী উদ্যোগে ক্ষমতায় বসেছে বাংলাদেশের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার।কার হাতে রাষ্ট্র তুলে দেওয়া হবে তা নিয়ে তাই ২০০৬ সনে তাই সংসদে, সচিবালয়ে বা কোন দেশী প্রতিষ্ঠানে বৈঠক বসেনি,বৈঠক বসেছে বিদেশী দূতাবাসে। অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে এ সরকারের চরিত্রটি এ জন্যই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো অন্ততঃ একটি সাংবিধানিক পথ ধরে এসেছিল। কিন্তু এখানে সে পথ অনুসরণ করা হয়নি। এরা ভোটের জোরে যেমন আসেনি,তেমনি বাহুবলেও আসেনি। তবে নাচার জন্য পুতুলের নিজ-শক্তি লাগে না,সে শক্তি জোগায় অন্যরা। তেমনি এক অবস্থা এ তত্ত্বাবধাক সরকারেরও। আর সে শক্তিটি যদি বিদেশী হয় তবে জাতির জন্য সেটি ভয়ংকর। তখন বিপন্ন হয় স্বাধীনতা। ফল দাঁড়িয়েছে, বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই দেশ এখন নির্ভরশীল বিদেশীদের দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর।এতদিন বিদেশী সাহায্য অপরিহার্য গণ্য হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। এখন সে নির্ভরশীলতা গ্রাস করছে নির্বাচন,প্রশাসন ও রাজনীতি সহ প্রায় সকল ক্ষেত্রগুলিকে।

 

এবারের নির্বাচন অতীতের নির্বাচনগুলি থেকে ভিন্নতর। কারণ,দেশজুড়ে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে অতি প্রকটভাবে। রাজপথে লগি-বৈঠা নিয়ে মানুষ হত্যার যে উৎসব হয় সেটি তো সে ঘৃণারই ফসল। আর সে ঘৃণা ছড়িয়েছে দেশের সেকুলার মেডিয়া। এজন্যই এটি ১৯৫৪ সাল নয়। ১৯৭০, ১৯৯১ বা ১৯৯৬ সালও নয়। এমন ঘৃণা ১৯৭০ সালে সৃষ্টি হলে লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক কর্মীর বেঁচে থাকাই কঠিন হত। ঘৃণা-ব্যবসায়ী সেকুলার মেডিয়ার এটিই বড় সফলতা। এ সফলতায় তারা এতটাই খুশী যে ৭১-এর অসমাপ্ত হত্যাকান্ড সমাপ্ত করতে আরেকটি একাত্তর চায়। তেমন একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা এঁটেছে এবারের ভোটযুদ্ধকে ঘিরে। কথা হল,এত ঘৃণা নিয়ে কি একপক্ষ কি অপর পক্ষের বিজয় মেনে নিতে পারে? পারে কি শান্তিতে বসবাস করতে পারে? বাংলাদেশের মূল সমস্যা এখানেই।সমস্যাটি তাই বাংলাদেশের ভূগোলে নয়, সেটি মন ও মননে তথা চেতনার মানচিত্রে। নির্বাচন যদি সত্যিই অনুষ্ঠিত হয় তবে তাতে কি দুই পক্ষকে জেতানো সম্ভব? জিতবে তো এক পক্ষ। এ অবস্থায় বিজয়ী দলকে কি পরাজিত দলের ক্যাডারগণ ক্ষমতায় থাকতে দিবে? বহু দলে ভোট ভাগাভাগী হয়ে যাওয়ায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অর্ধেক ভোটও লাগে না। অতীতে যারাই ক্ষমতায় গেছে তারা শতকরা ৪০ ভাগ ভোটও পায়নি। এর চেয়ে বেশী ভোট আগামীতেও লাগবে না। ফলে ক্ষমতাসীন দল শুরু থেকেই সংখ্যালঘু দূর্বল সরকার। সরকারের বাইরে থাকে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। তাই কঠিন নয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা যুদ্ধ শুরুর কাজটিও ।

 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচন নিছক ভোটযুদ্ধ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই সেটি রক্তাক্ষয়ী রাজনৈতিক যুদ্ধে –এমনকি গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়। আলজেরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, থাইল্যান্ড, বার্মা, কেনিয়া, কঙ্গো, জিম্বাবুয়ের নির্বাচন তারই উদাহরণ। পাকিস্তানের নির্বাচনও সে দিকেই এগুচ্ছে। এসব দেশে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্য, কৌশলে নিজেকে বিজয়ী রূপে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ নেওয়া। তাছাড়া বাংলাদেশের ন্যায় দেশে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া কি কঠিন? অতীতে একাধিকবার বিজয়ী হয়েছে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী এরশাদ। পাকিস্তানে বিজয়ী হয়েছে পারভেজ মোশাররফ। মিশরে গত তিরিশ বছর শতকরা ৯৮ ভাগ ভোট নিয়ে জিতছে হোসনী মোবারক। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য এসব দেশে ভোটের চেয়ে বেশী প্রয়োজন একটি দুর্বৃত্ত প্রশাসনের। বাংলাদেশে তেমন একটি প্রশাসনিক অবকাঠামো প্রস্তুতই আছে। দেশকে ৫ বার দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম করার মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তিতে সে পারঙ্গমতা তারা প্রমাণও করেছে। এমন প্রশাসন এরশাদের ন্যায় দুর্বৃ্ত্তকে অসংখ্য বার বিজয়ী করতে পারে।এবং সে সম্ভাবনা বর্তমান সরকারকে নিয়ে আরো বেশী। কারণ জন্ম থেকেই এ সরকারটি রহস্যময়।সে সাথে পক্ষপাতদুষ্টও। ইসলামের বিরুদ্ধে বৈরিতায়ও তারা কোন অস্পষ্টতা রাখেনি,সুস্পষ্ট পক্ষ নিয়েছে ইসলাম বিরোধী এনজিও’র। তাই ভয়ানক সংশয় বেড়েছে নির্বাচন নিয়েও। বিশেষ করে দেশের ইসলামপন্থিদের মনে। নির্বাচন যদি সত্যই অনুষ্ঠিত হয়,এ রহস্যময়তার কারণেই প্রচন্ড সংশয় থাকবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও। তখন পরাজিতদের জন্য সহজ হবে সে রায়কে অস্বীকার করা। তখন তাদের একমাত্র রাজনৈতিক এজেন্ডা হবে, যে ভাবেই হোক ক্ষমতাসীনদেরকে ক্ষমতা থেকে হটনো। আর এতে দেশ তখন ধাবিত হবে রাজনৈতিক সংঘাত বা গৃহযুদ্ধের দিকে।

 

নির্বাচন ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি গুরুতর কারণও রয়েছে। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অর্থ রায় দেওয়া। এখানে রায় দেয় জনগণ। জনগণের সে রায়ের বলেই বিজয়ীরা পায় দেশ শাসনের অধিকার। গণতন্ত্র তাই ভোটার বা সাধারণ নাগরিকের উপর দেশ-শাসনে বড় রকমের দায়বদ্ধতা দেয়। রাজতন্ত্রে বা স্বৈরতন্ত্রে সে অধিকার ও সুযোগ সাধারণ মানুষের থাকে না। বিলেত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নাগরিকগণ শুধু ভোটই দেয় না, আদালতে রায়ও দেয়। তাদেরকে দেওয়া হয় জুরিষ্টের মর্যাদা। তাদেরকে বেছে নেওয়া হয় ভোটার তালিকা থেকে লটারীর ন্যায় র্যাওন্ডম পদ্ধতির মাধ্যমে। তাই ভাগ্যগুণে যে কোন ভোটারই হতে পারেন জুরিষ্ট। এবং জুরিষ্ট হিসাবে আদালত থেকে ডাক পড়লে সে কাজে যোগ দেওয়া তার উপর বাধ্যতামূলক হয়।সে দায়িত্বপালনে অবহেলা হলে সেটি গণ্য হয় শাস্তিযোগ্য অপরাধরূপে। ব্যারিস্টারগণও আদালতে এরূপ জুরিষ্টদের উদ্দেশ্য করেই তাদের যুক্তিপ্রমাণ পেশ করে, জজকে উদ্দেশ্য করে নয়। ভোটাররা আদালতে বসে যাকে দোষী বা নির্দোষ সাব্যস্ত করেন জজ তাতে কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। জজের কাজ,জুরিষ্টদের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির উপর আইন মোতাবেক শাস্তির প্রয়োগ এবং নির্দোষ ব্যক্তির মুক্তিদান।।আর নির্বাচনে আদালত বসে সমগ্র দেশ জুড়ে। এখানে জুরিষ্ট বা রায়প্রদানকারি হল প্রতিটি ভোটার। বাদী-বিবাদী হল প্রার্থীরা। এবং উকিলের ভূমিকায় নামেন দেশের জ্ঞানীজনেরা। নির্বাচনী কমিশনারের কাজ,বিচারকের দায়িত্বপালন। সফল নির্বাচনের জন্য প্রত্যেকের দায়িত্বই এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সে দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হলে বিফল হয় নির্বাচন। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ভোটারদের। আদালতের রায়দানের ন্যায় নির্বাচনের রায়দানের কাজও মূলতঃ তাদের। ন্যায় ও সত্যের প্রতি তাদের সদা নিষ্ঠাবান থাকতে হয়।নইলে নির্বাচিত হয়ে অকল্যাণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা।

 

কিন্তু কথা হল,যোগ্যতা ছাড়া কোন দায়িত্বই কি সঠিক ভাবে পালিত হয়? রাস্তায় ঝাড়ু দিতেও কিছু যোগ্যতা লাগে। নইলে আবর্জনা জমে লোকালয়ে। আর ভোটারদের অযোগ্যতায় আবর্জনা জমে প্রশাসনে ও রাজনীতিতে। তখন বিপর্যয় নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে। বাংলাদেশে অতীতে সর্বগ্রাসী দূর্নীতি, বাকশালী স্বৈরাচার,দুর্ভিক্ষ, ভারতীয় দখলদারি, অর্থনৈতিক ধ্বস এবং রক্ষিবাহিনীর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে এসেছিল ভোটারদের সে অযোগ্যতার কারণেই। নির্বাচনে বা আদালতে রায় দিতে যে যোগ্যতাটি অপরিহার্য সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও নয়, বরং সেটি হল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার নৈতিক বল। তাই গণতান্ত্রিক দেশে কারো ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা দেখে আদালতে ডাকা হয় না। কারণ সেরা ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা ন্যায়পরায়ন হওয়ার গ্যারান্টি দেয় না। ডিগ্রিধারী বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিটিও লিপ্ত হতে পারে অতি জঘন্য অপরাধ কর্মে। বাংলাদেশে এমন দুর্বৃত্ত ডিগ্রিধারী এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তির সংখ্যা তো লক্ষ লক্ষ। অপর দিকে যে ব্যক্তির বিবেক ভেসে যায় গায়ের রঙ, ভাষা,ভূগোল,দল, গোত্র বা পরিবারের প্রতি আনুগত্যে, তার কি সে সামর্থ থাকে? থাকে না। আদালতের জুরিষ্টদের জন্য এমন ভাবে ভেসে যাওয়াটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রায় দানের জন্য আলোকিত হতে হয় বিবেককে। নইলে ব্যর্থ হয় বিচার। অপরাধী ব্যক্তি তখন জেলে না গিয়ে সমাজে নেমে আসে। তখন দুর্বৃত্তির প্লাবন শুরু হয় রাষ্ট্র জুড়ে।তাই রাষ্ট্র দুর্বৃত্ত-কবলিত হলে দায়ী শুধু সরকার নয়,জনগণও।তখন প্রমাণ মেলে,সরকার নির্বাচনের যে গুরু দায়িত্ব জনগণের উপর ছিল সেটিই পালিত হয়নি। তাই সফল রাষ্ট্র নির্মাণে রাস্তাঘাট, কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব থাকলেও সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল বিবেকমান মানব-নির্মাণ।সভ্য জাতিরা তাই গুরুত্ব দেয় চরিত্র গড়ায়। তবে সে যোগ্যতা নিছক রাজনৈতিক বক্তৃতায় সৃষ্টি হয় না। বাড়ে না পড়া-লেখার সামর্থ বাড়াতে। এজন্য চাই উন্নত জীবন-দর্শন। মুসলমানের জীবনে সে দর্শনটি হল ইসলাম। রাষ্ট্রের কল্যাণে ইসলাম শুধু ভোটদানেই ন্যায়নিষ্ঠ করে না, নিষ্ঠাবান করে সে লক্ষ্যে অর্থদান, শ্রমদান, এমনকি প্রাণদানেও। ইসলামে এমন কাজ পবিত্র জ্বিহাদ। কিন্তু সেকুলারিজম ব্যক্তির জীবন থেকে সে বিপ্লবী শক্তিটাই কেড়ে নেয়। দেয় একটি পার্থিব লাভ-লোকসানের ধারণা। এমন চেতনার প্রসার বাড়লে শাড়ী-লুঙ্গি বা অর্থ দিয়েও তখন ভোট কেনা যায়। বাংলাদেশে মূলতঃ সেটিই হচ্ছে।

 

অথচ আল্লাহর সামনে জবাবদিহীতার ভয় বাড়লে মিথ্যাচারি দুর্বৃ্ত্তকে ভোটদান দূরে থাক,ভোটারগণ সচেষ্ট হয় তার নির্মূলে।এমন কাজ তো জ্বিহাদ। ইসলামের লক্ষ্য,সমাজে এমন দায়িত্বশীল উদ্যোগী মানুষের সৃষ্টি। সমাজে এরা সুনীতির বিজয় আনে। নবী (সাঃ)তার জীবনের সবচেয়ে অধিক সময় ব্যয় করেছেন এমন সৃষ্টিশীল কাজে। এজন্যই তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। মানবিক গুণের পরিচর্যা এতটা বেড়েছিল যে,যারা ভেড়া চড়াতেন বা ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিকাজ করতেন তারাও পরিণত হয়েছিলেন সুযোগ্য কাজী বা বিচারকে। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিচার-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তো তাদের হাতেই। বিচার তখন ক্রয়-সামগ্রীতে পরিণত হয়নি,আদালতের নামে উকিল-ব্যারিস্টারদের বাজারও বসেনি। বিচারক হওয়ার পাশাপাশি তারা সেদিন পরিণত হয়েছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিজ্ঞ নির্বাচক মন্ডলিতেও। ফলে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের ন্যায় যুদ্ধাপরাধী দুর্বৃত্তদের নির্বাচিত হওয়াটিই তখন অভাবনীয় ছিল। তখন নির্বাচিত হয়েছেন হযরত আবু বকর(রাঃ), হযরত ওমর(রাঃ,হযরত ওসমান(রাঃ)ও হযরত আলীর(রাঃ)ন্যায় জান্নাতের ওয়াদা লাভকারি মহান বেহেশতি মানুষেরা। সে সময় অন্যান্য দেশ জর্জরিত হচ্ছিল রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারে।

 

তাই কোট-কাছারি প্রতিষ্ঠা করাটাই বড় কথা নয়। সঠিক রায় দানের নৈতিক সামর্থও থাকা চাই। লক্ষ্য হওয়া চাই,ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়কারির শাস্তি।এবং সে নির্দেশটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন একদল মানুষ অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে। ন্যায়ের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে। এবং তারাই হল সফলকাম।”- (সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)। তাই ইসলামে একাজ ইবাদত। বিপরীত কাজটি হল আল্লাহর অবাধ্যতা। সৎ ও ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া তাই নিছক রাজনীতি নয়, এটিই ইসলামের মৌলনীতি। সাহাবাগণ এ লক্ষ্যে বহু জ্বিহাদ লড়েছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে এ কাজ যদি শান্তিপূর্ণ ভাবে হয় তবে জাতি এক রক্তক্ষয় থেকে বাঁচে। আর সেটি ব্যর্থ হলে ব্যর্থ হয় নির্বাচন বা ভোটদান। তাই বার বার নির্বাচন হওয়াটাই বড় কথা নয়। ইবাদতের দায়িত্ব-পালনও হওয়া চাই। ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিদের বিজয় এবং দুর্বৃত্তদের পরাজয়ও হওয়া চাই। নইলে দেশের উপর দখলদারি নেয় ক্ষমতালিপ্সু নেতারা।এক কালে এ লক্ষ্যে নমরুদ-ফেরাউনেরা প্রকান্ড যু্দ্ধে লিপ্ত হত। আর এখন তাদের উত্তরসুরীরা লিপ্ত হচ্ছে নির্বাচনে। যে দেশে এরশাদের ন্যায় শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী পাঁচটি নির্বাচনী আসন থেকে নির্বাচিত হয়, নির্বাচিত হয় জয়নাল হাজারী বা শামীম ওসমানীর ন্যায় দুর্বৃত্তরা -সেদেশে নির্বাচক মন্ডলীর রায়-প্রদানের সামর্থ যে কতটুকু তা নিয়ে কি বুঝতে বাঁকী থাকে? বিচার কাজে জেলা, এলাকা, দল বা পরিবার নিয়ে পক্ষপাতিত্ব করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তেমন পক্ষপাতিত্বের কারণে যে কোন সভ্য দেশে বিচারক চাকুরী হারায়। বরখাস্ত হয় জুরিস্ট। আর ইসলাম ধর্মে এটি মহাপাপ। এমন পক্ষপাতিত্বে শাস্তি বাড়ে আখেরাতে। তাই প্রকৃত মুসলমান দেখে কোনটি ন্যায়, আর কোনটি অন্যায়। দেখে কে সৎ আর কে অসৎ। ঈমানদার ব্যক্তি বাদী-বিবাদীর গায়ের রঙ, ভাষা বা এলাকা দেখে না। অথচ জাতিয়তাবাদ, বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতা ও ট্রাইবালিজম জনগণের সে সামর্থটিকেই হরণ করে। অথচ বাংলাদেশে এসব মতবাদের চর্চাই প্রবল ভাবে বেড়েছে। মুখের ভাষা বাংলা না হওয়ার কারণে একাত্তরে বহু হাজার বিহারী ও পাকিস্তানীকে হত্যা করা হয়েছে। দখলে নেওয়া হয়েছে তাদের বাড়ীঘর ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে। এমন একটি হিংস্র ও দখলদারি চেতনায় কি ব্যক্তির সামর্থ থাকে ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নেওয়ার? নেই বলেই দেশে বার বার অসম্ভব হচ্ছে সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচন। যদি ইসলামের আরবী-ভাষী নবী স্বয়ং প্রার্থী হতেন ক’জন বাঙ্গালী তাঁকে ভোট দিতেন? ক’জন সমর্থন করে নবীজী (সাঃ)রইসলামি শিক্ষা, শরিয়তী বিচার ব্যবস্থা ও সূদমূক্ত অর্থনীতিকে? দেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ কি দেশে সে পরিবেশ রেখেছেন? এমন বিভ্রান্ত চেতনায় দেশে নির্বাচন একবার নয়, হাজার বার হলেও কি কল্যাণ হবে? তাছাড়া বাংলাদেশের যে বিভাজন সেটি কি শুধু রাজনৈতিক? এটি তো দর্শনগত তথা আদর্শগতও। তাই কেনিয়া, কঙ্গো, জিম্বোবুয়ে বা থাইল্যান্ডের বিভাজনের চেয়েও এ বিভাজন গুরুতর। রাজনৈতিক উত্তাপের চেয়ে আদৌ কম নয় এসব বিভক্ত মানুষের অন্তরের উত্তাপ। ফলে এ বিভাজন নিছক কিছু বৈঠক করে দূর হওয়ার নয়। নির্বাচন করেও নয়। এমন অবস্থায় নির্বাচন যেটি প্রসব করে সেটি শান্তি নয়, সুখ-সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতিও নয়। বরং তা হল সংঘাত, যুদ্ধ ও বিপর্যয়। বাংলাদেশ কি সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে না?
Comments (2)
2 Sunday, 28 December 2008 02:07
Farhad

Thanks. May Allah bless you.

1 Sunday, 21 December 2008 07:12
Habib

Fantastic work. The nation specially a large number of young people are looking for this type of writings so that masses can be aware. But we are so unfortunate that, we do not find much ariticle or writer of such value. I pray to Allah (SWT) for your good health .. Aameen.



Bookmark this,
 
Banner