|
গত ৩০শে জানুয়ারী অতিশয় অসভ্য ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ৬ই ফেব্রুয়ারি খবর ছেপেছে সেখানে কলেজের শতবর্ষপূর্তি নিয়ে গানের আয়োজন করা হয়েছিল। দায়িত্বে ছিল সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রনাধীন ছাত্র সংসদ। ‘প্রথম আলো’ যা ছেপেছে তা হলোঃ “ব্যান্ডের গান শুরুর আগেই হাজার হাজার তরুণ-যুবক ঢুকে পড়ে নারীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে। শুরু হয় বিশৃঙ্খলা থেকে তাণ্ডব। দুই তরুণীকে আমি অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে পাশের বাড়িতে পৌঁছে দিই। ১৫ মিনিট পর ফিরে এসে দেখি, সেই একই অবস্থা। আরও দুই তরুণী আমাকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার আকুতি জানায়। প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়া এমন ৪০ থেকে ৫০ জনকে আমি উদ্ধার করতে দেখেছি।’ এটি ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের গত ৩০ জানুয়ারির রাতের ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শী এক তরুণ এভাবেই সেদিনের তাণ্ডবের বিবরণ দেন প্রথম আলোর কাছে। আনন্দমোহন কলেজের শতবর্ষপূর্তি উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে ঘটে এ অপ্রীতিকর ঘটনা।
দুই দিন ধরে আনন্দমোহন কলেজের দুটি ছাত্রী হোস্টেল, আশপাশের কয়েকটি ছাত্রী মেস ও শহরের বিভিন্ন বয়সী নারীদের সঙ্গে কথা বলে এ ঘটনার সত্যতা মিলেছে। সেদিন রাতে একদল তরুণ পুলিশ-র্যাব, রাজনৈতিক নেতা ও কলেজের শিক্ষকদের সামনেই নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছে, অনেকের শ্লীলতাহানির চেষ্টাও করেছে। তবে লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নেননি। এমনকি প্রকাশ্যে চিকিৎসাও নিতে যাননি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ময়মনসিংহ শহরের অনেকের মনে চাপা ক্ষোভ আছে এ নিয়ে।” ঘটনার মধ্যে এতটাই অসভ্যতা প্রকাশ পেয়েছে যে স্থানীয় জনগণও বিষয়টি লুকাতে চাচ্ছে। ‘প্রথম আলো’ তাই লিখেছে, “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি জানাজানি হোক, তা চান না স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। তাই সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি চেপে যান।”
খবরে আরো প্রকাশ, “দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী আনন্দমোহন কলেজের শতবর্ষপূর্তি উৎসবের প্রস্তুতি চলছিল দুই বছর ধরে। ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি ছিল সমাপনী উৎসব। এ নিয়ে পুরো শহরে ছিল সাজ সাজ রব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরুর সময় পেছন থেকে কয়েক হাজার দর্শক ঢুকে পড়ে নারীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি। এ সময় অধিকাংশ নারী বের হয়ে যেতে পারলেও প্রায় পাঁচ শ’ নারী আটকা পড়েন। উচ্ছৃঙ্খল দর্শনার্থীরা এরই মধ্যে অনেকের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। ভুক্তভোগীদের চিৎকারে তখন ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।” আরো একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি এক তরুণকে তার জ্যাকেট খুলে আরেক তরুণীকে সাহায্য করতে দেখেছেন। মাঠের আশপাশের আরও কয়েকজন দর্শনার্থী ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, সেখানে তাঁরা মেয়েদের অনেক জুতা-স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেছেন। কয়েক শ প্লাস্টিকের চেয়ার ভাঙা হয়েছে। সেদিনের কথা মনে করতেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন আরেক তরুণী। তিনি জানান, সেই উৎসবে অনেকে গেছেন স্বামীর সঙ্গে, কেউ সন্তানের সঙ্গে, কেউ বা সহপাঠীদের সঙ্গে। কয়েক হাজার উচ্ছৃঙ্খল তরুণের এ তাণ্ডব দেখে হতবাক সবাই।
পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “কলেজের পাশের এলাকা হামিদ উদ্দিন রোডের একটি মেসের ছাত্রী বলেন, ‘অশ্লীলতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারছিলাম না।’ মীরবাড়ি সড়কের এক দোকান কর্মচারী বলেন, ‘লাঠি দিয়ে আঘাত করেও অনেক ছেলেকে তাণ্ডব থেকে ফেরানো যাচ্ছিল না।’ ভুক্তভোগী এক তরুণী বলেন, ‘মানসিকভাবে আমরা ভেঙে পড়েছি। না পারছি পরিবারকে জানাতে, না পারছি চিকিৎসা নিতে।’ ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলন ও সংগ্রাম কমিটির সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী আনিসুর রহমান খান বলেন, ‘শুনেছি, সেখানে শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।’
এ ব্যর্থতা শুধু ক’য়েক শত দুর্বৃত্তের নয়। এ ব্যর্থতা সকল বাংলাদেশবাসীর। বাংলাদেশ মানব-শিশুকে মানুষ রূপে বেড়ে উঠার পরিবেশ সৃষ্টিতেই ব্যর্থ হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের বড় কাজ শুধু এ নয় যে, সে শুধু রাস্তাঘাট ও কলকারখানা গড়বে ও চাকুরি সৃষ্টি করবে। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মানুষকে মানুষ রূপে বেড়ে উঠাকে সুনিশ্চিত করা। গরুবাছুর ও জীবজন্তু থেকে মানুষের এখানেই বড় পার্থক্য। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশকে হারিয়ে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের শিরোপা পেয়েছে। এ খবরটিতে বাংলাদেশের মানুষের মনে টনক পড়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং যাদের বিচারে বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে প্রথম খেতাব পেল তাদেরকেই গালীগালাজ করা হয়েছে। বিচারকদের গালীগালাজে যতটা সময় ব্যয় হয়েছে নিজেদের শুধরানোর কাজে সেটি হয়নি। ফলে বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণও মেলেনি। এখন সে অবক্ষয়ের পথ বেয়েই চারিত্রিক কদর্যতায় শিরোপা পাওয়ার পথ নির্মিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের চারিত্রিক অবক্ষয় ও নোংরামী যে কতটা ভয়াবহ ভাবে বেড়েছে ৩০ই জানুয়ারির ময়মনসিংহের ঘটনাটি হলো তারই এক নমুনা। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা পর্বতসম বিশাল বরফখন্ড যেমন সামান্য শিরটুকু বের করে চলে তেমনি বাংলাদেশের গভীরেও লুকিয়ে থাকা চারিত্রিক অবক্ষয়ের এ হলো সামান্য রূপ। মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার পথে অশ্লিলতা ও হুমকীর মুখে পড়ছে এবং লজ্জাশরমের ভয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছে -সে খবরও বহুবার হয়েছে। টিভিতেও বিষয়টি খবর হিসাবে এসেছে। বহুবার ২১শে ফেব্রুয়ারীর রাতে ঢাকার রাজপথে বহু নারীর শ্লীলতাহানিও ঘটেছে। কিন্তু এখন সেটিই যে কতটা মহামারি আকারে বেড়েছে সেটির প্রকাশ ঘটলো ময়মনসিংহে। আরো ভয়াবহ আশংকার কারণ হলো, ঘটনা ঘটেছে রাতের আঁধারে কোন নির্জন নিভৃত গ্রামে নয়। বরং শহরের প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষ, পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের চোখের সামনে। সেটি কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট ধরে নয়, বহুক্ষণ ধরে। আলো-ঝলোমলে শহুরে পরিবেশে হাজারো মানুষের চোখের সামনের যদি নারীর ইজ্জত রক্ষা না পায় তবে গ্রামগঞ্জের অন্ধকার পরিবেশের প্রহরাহীন সাধারণ নারীরা যে কতটা অরক্ষিত সেটি কি বুঝতে বাঁকী থাকে? অথচ সরকারের এ নিয়ে কোন জবাবদিহীতা নেই।
এটি বড় রকমের এক চারিত্রিক অবক্ষয়। বিপদের আরো কারণ, এমন ঘটনা বার বার ঘটলেও দেশের সরকার ও বুদ্ধিজীবীগণ এ চারিত্রিক অবক্ষয় রোধে কোন পথ দেখাতে পারছেন না। শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন এই বাংলাদেশেই ধর্ষণে সেঞ্চুরী পালনের উৎসব হয়েছিল। সেটিও কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে নয়, বরং জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় একটি সর্বো্চ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ধর্ষণ বিশ্বের প্রতিদেশেই অপরাধ। অপরাধীকে সবদেশেই কারাগারে যেতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বার বার অপরাধ ঘটানোর পরও সে জঘন্য অপরাধীকে একদিনের জন্যও কারাগারে যেতে হয়নি, বরং তা নিয়ে উৎসব হয়েছে। ইতিহাসে সেটিও ছিল রেকর্ড। উঁইপোকা জানে কখন গর্ত ছেড়ে ডানা মেলে উড়তে হয়। তেমনি অপরাধীরা জানে কখন অপরাধকর্ম নিয়ে উৎসব করা যায়। তাই হাসিনার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসাতে আবার নতুন রেকর্ড নির্মানের কাজ শুরু হয়েছে। দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী ক্রমবর্ধমান নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে সময় সময় পত্রিকায় লেখেন ও টিভিতে আলোচনা করেন। কিন্তু কি করে এ রোগ থেকে মুক্তি মিলবে সে সমাধান তাদের কাছে নেই। কারণরূপে তারা মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা বলছেন। কিন্তু কি করে মূল্যবোধের সে অবক্ষয় রুখা যায় সে ঔষধ তাদের হাতে নেই। সমাধান রূপে অনেকে বলছেন শিক্ষা-বিস্তারের কথা। কিন্তু যারা সেদিন ব্যাভিচারে ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা কি নিরক্ষর ছিল? বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক নিরক্ষর মানুষের বসবাস হাজারো বছর ধরে। কিন্তু কোন কালেও কি এমন বর্বর ঘটনা নিরক্ষর মানুষের হাতে ঘটেছে? তারা বলেন, সংস্কৃতি-মনস্কতার কথা। অথচ এ ঘটনাটি ঘটেছে কোন বেদের পল্লিতে নয়, কোন বুঁনো বা সাঁওতাল পাড়াতেও নয়, বরং যে নাচ-গান সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথাটি তারা বলেন তারই এক বিশাল সমাবেশে।
আসলে বাংলাদেশের সরকার ও বুদ্ধিজীবীদের বড় ব্যর্থতা তারা রোগ বুঝতেই ভূল করেছেন। ব্যাভিচার নিজে কোন রোগ নয়, এটি হলো এক ভয়ানক রোগের সিম্পটন মাত্র। রোগটি হলো জীবন-দর্শনের। মানুষের আচার-আচরন, কর্ম ও সংস্কৃতি হলো তার অন্তরে লুকিয়ে থাকা জীবনদর্শনেরই প্রকাশ। জীবন-দর্শন সবার এক নয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সাহিত্যা যে দর্শনের পরিচর্যা দেয় সেটি হলো সেকুলার দর্শন। সেকুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগতিকতা। তাই এ দর্শনের মূল কথা হলো ইহলৌকিক স্বার্থসিদ্ধি। সেটির মধ্যে স্বভাবতঃই যৌনস্বার্থসিদ্ধির বিষয়টিও এসে যায়। পারলৌকিক স্বার্থচেতনাকে তারা বলে পশ্চাতপদতা বা সাম্প্রদায়ীক চেতনা। পরকালের জান্নাত লাভের চিন্তাটি তাই তাদের কাছে গুরুত্বহীন। পার্থিব এ জীবনে নগদ যা পাওয়া যায় সেটি ভোগের বিষয়টিই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দূরের জান্নাত লাভের আশায় এ জীবনে অবাধ যৌন স্বার্থউদ্ধার থেকে বিরত থাকতে তারা রাজী নয়। তাই তারা যৌনক্ষুধা পূরণে ক্ষুদার্ত নেকড়ের ন্যায় সর্বত্র শিকার খুঁজে। মানুষরূপী এমন ক্ষুদার্ত পশুগুলোই সেদিন মওকা বুঝে মেয়েদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। ফলে বাংলাদেশে যতই বাড়ছে সেকুলারিজম ততই বাড়ছে মানুষবেশী এমন ক্ষুদার্ত পশুদের সংখ্যা। এবং তাদের কারণে দ্রুত বাড়ছে ব্যাভিচার, মদ-জুয়া ও নানারূপ মাদক সামগ্রীর ব্যবহার। একমাত্র পরকালের ভয়ই মানুষকে এসব ক্ষণস্থায়ী পার্থিব স্বার্থ-শিকার থেকে দূরে রাখতে পারে। পরকালে জান্নাত লাভের আশায় মানুষ তখন নিজের প্রিয় জানটুকু আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে জিহাদে হাজির হয়। ফলে তার কাছে অতি সহজ হয় পাপাচার পরিত্যাগ করা। আরবের পাপাচারপূর্ণ মানুষের জীবনে যে বিস্ময়কর চারিত্রিক বিপ্লব এসেছিল তার মূলে তো ইসলামী দর্শন ও পরকালের ভয়। আল্লাহর ভয় তখন ব্যক্তিকে পাপের পথ থেকে দূরে রাখে। এ ভয় তখন মনের গভীরে সব সময় পুলিশের কাজ করে। সন্ধান দেয় সিরাতুল মোস্তাকিমের। দুর্বৃত্তি-কবলিত পুলিশ ও আদালতের ভয় কি সেটি পারে? কিন্তু বাংলাদেশে আল্লাহর ভয় সৃষ্টির কাজটাই যথাযথ হচ্ছে না। ইসলামি জীবন-দর্শন ও আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকিম এখন আর যুবকদের সরকারি খরচে শেখানো হয় না। টিভিতেও তা নিয়ে তেমন প্রোগ্রাম হয় না। দেশের বুদ্ধিজীবীগণও তা নিয়ে তেমন লিখেননা। বরং প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে সেকুলার চেতনাকে প্রবলতর করার কাজে। এবং সে চেতনার চর্চা বাড়াতে ব্যাপকতর করা হয়েছে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নাচ-গান, স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগমুখি সাহিত্য।
বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটি হলো আওয়ামী লীগ। তাদের রাজনৈতিক অঙ্গিকার হলো, সেকুলারিজমের প্রতিষ্ঠা। ফলে দলটি ক্ষমতা আসার পর থেকেই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে এমন সব অসংখ্য প্রতিষ্ঠান যার কাজ হচ্ছে সেকুলার চেতনার প্রসার এবং ইসলামী চেতনার বিলুপ্তি। সরকারি উদ্যোগে বাড়ানো হয়েছে নাচগান ও নাটক-সিনেমার চর্চা। মেয়েদের হাফপ্যান্ট পড়িয়ে কুস্তিতে নামানো হয়েছে। নামানো হয়েছে ফুটবল, হকি, সাঁতার ইত্যাদী খেলাতে। শুধু স্টেডিয়ামের হাজার হাজার মানুষের সামনেই শুধু নয়, টিভির পর্দায় সারা দেশের মানুষকে সেটি দেখানো হচ্ছে। ইসলামে যেখানে মেয়েদের মাথায় কাপড় না দিয়ে রাস্তায় বেরুনোই আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিদ্রোহ, সেখানে সরকারি খরচে শুধু মাথার কাপড় নয়, গায়ের বস্ত্রের বেশীর ভাগ খেলার মাঠে খুলে প্রায় উলঙ্গ হতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এবং সেটি টিভিতে দেখানো হচ্ছে। এভাবে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে দেশজুড়ে। ইসলামী চেতনার প্রসার রোধে এভাবেই পরকল্পিত ভাবে যুবক-যুবতীদের বিদ্রোহী করা হচ্ছে আল্লাহর বিরুদ্ধে। এভাবে সরকারি খরচে পথভ্রষ্ট করা হচ্ছে সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে। আর এভাবে যেখানে পথভ্রষ্টতা বাড়ানো হয় সেখানে ব্যাভিচারের ন্যায় পাপাচার বাড়বে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?
সেকুলারিজমের চর্চা প্রচন্ড ভাবে ব্যাভিচার বাড়িয়েছে পাশ্চাত্য জগতেও। পাশ্চাত্য সমাজ সেটি রোধের চেষ্টা না করে বরং সে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশাকেই তারা শুধু সমাজ-সিদ্ধই করেনি, ব্যাভিচারকেও আইনগত বৈধতা দিয়েছে। এসব দেশে স্কুল-কলেজসহ বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়েছে বিনামূল্যে কনডম জোগানো। বাপ-মাকেও নিজের ঘরের দরজা খুলে দিতে হয় তার মেয়ে বা ছেলেকে নিজঘরে বন্ধুর সাথে ব্যভিচারের সুযোগ দিতে। এমন ব্যাভিচারকেই তারা জীবনের রীতি মনে করে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রধান কাজ, সে যৌনক্ষুধাকে তীব্রতা দেওয়া। এ জন্যই দেশের আঁনাচে-কাঁনাচে গড়ে উঠেছে ক্লাব, মদের দোকান, উলঙ্গ নাচের ঘর, ইত্যাদী। সে যৌনক্ষুধা নিবৃত করতে ব্যাভিচারকে বৈধ করার পাশাপাশি বাজারে নামানো হয়েছে লক্ষ লক্ষ পতিতাকে। পাপের রাস্তা এভাবে খুলে দেওয়ার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিটি পাশ্চাত্য দেশে নারীরা পথেঘাটে, অফিস-আদালতে এবং গৃহে প্রতি মিনিটে ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। দেশের সমগ্র নগর বন্দর ও রাস্তায় লক্ষ লক্ষ গোপন ও দৃশ্যমান ক্যামেরা বসিয়েও অপরাধীদের তারা রুখতে বা ধরতে পারছে না। আর যদি শহরে বিদ্যূত চলে যায় অন্ধকারের সাথে বীভৎস অসভ্যতাও নেমে আসে। তখন যেন শিকার ধরতে হাজার ক্ষুদার্ত নেকড়ে জঙ্গল ছেড়ে জনপদে নেমে আসে। তখন প্রচন্ড সয়লাব শুরু হয নারীধর্ষন ও লুটতরাজের। এমন ঘটনা ঘটেছিল নিউয়র্কে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায়।
পাপের প্রবণতা বাড়িয়ে কখনও পাপ কমানো যায় না। ব্যাভিচার যেমন পাপ, তেমনি এক জঘন্য পাপ হলো ধর্ষণ। তাছাড়া মদের নেশার ন্যায় পাপের নেশাও মানুষকে কখনও তৃপ্ত হতে দেয়না, বরং আরো নেশাগ্রস্ত বাড়ায়। নেশার তাড়নায় সে আরো শিকার খুঁজে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে আজ যেভাবে পাশ্চাত্য ধাঁচের পোষাক-পরিচ্ছদ, নাচগান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা শুরু হয়েছে সেটিগুলী কি সেই অভিন্ন পথেই টানবে না? কারণ এসব অশ্লিল পোষাক-পরিচ্ছদ, নাচগান, সিনেমা-নাটক, মদ ও যৌনউদ্দীপক সাহিত্যের কাজই হলো ব্যাভিচারের পথে মানুষকে আরো উত্তেজিত করা। এমন মানুষের জীবনে তখন নেমে আসে ভয়াবহ বিপথগামীতা। বাংলাদেশে আজ সে পথেই দ্রুত ধাবমান হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের আজকের মন্দা বা বিপর্যয় নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং আদর্শিক। এবং সেটি ব্যাপক বিপর্যয় নিয়ে হাজির হায়েছে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণে। তবে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের এ অপরাধ ঠেকাতে বাংলাদেশের সামর্থ নেই দেশ জুড়ে ক্যামেরা বসানোর। ফলে সম্ভব নয় দুর্বৃত্তদের উপর রাতদিন ২৪ ঘন্টা নজরদারীর। সামর্থ নেই পুলিশ, আদালত ও প্রশাসন থেকে দুর্বৃত্তি দূর করার। অপর দিকে আল্লাহর ভয় কমে যাওয়ায় বিলুপ্ত হয়েছে মনের পুলিশ। ফলে অপরাধের পথে বাধা যেমন নেই, তেমনি ভয় নেই বিচারের। অপর দিকে নরনারীর যৌন ক্ষুধায় যেভাবে দিবারাত্র সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে সেটি অতৃপ্তই থেকে যাচ্ছে। বিবাহকে করা হয়েছে কঠিন। অনেকে যৌন ক্ষুধা পূরণ করছে পতিতা পল্লিতে গিয়ে। আর যারা পারছে না তারা দিবারাত্র ক্ষুদার্ত নেকড়ের ন্যায় শিকারের তালাশে থাকে। ২০১০ সালের ৩০ জানুয়ারীর রাতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে শত শত নারীর জমায়েত তাদের সে সুযোগ এনে দেয়।
অতিশয় লজ্জার বিষয় শুধু এ নয় যে, সেখানে শত শত নারীর উপর মানবরূপী শত শত বর্বর পশুর হামলা হলো। বরং আরো লজ্জার বিষয়, সে অপরাধ ক্ষেত্র থেকে কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি। কারো বিরুদ্ধে কোন মামলাও দাঁড় করানো হয়নি। ময়মনসিংহের মানুষ বরং ভূলে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেন কিছুই হয়নি, যেন তারা কেউ কিছু শুনেইনি। দুর্বৃ্ত্তদের জন্য এমন স্বর্গরাজ্য দুনিয়াতে কি আর কোথাও আছে? দেশটি পরিণত হয়েছে নিভৃত জঙ্গলে। জঙ্গলে প্রতিদিন বহু পশু হতাহত হয়, বহুপশু যৌনতারও শিকার হয়। কিন্তু তা নিয়ে কোন বিচার বসে না। কোথাও কোন কথা উঠে না। জঙ্গলে ঘটা সে ঘটনা পত্রিকার পাতায় বা টিভিতে কোন খবর হয় না। বাংলাদেশও যেন সে পথই ধরেছে।
তবে এক্ষেত্রে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। বিশাল দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকেরও। যে দেশের মানুষ চোখের সামনে অপরাধ হতে দেখেও বাধা দেয় না, বা আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেয় না সে দেশের মানুষের সভ্যভাবে জীবন-যাপনের অধিকার থাকে কি? মুসলমান হওয়ার বড় দায়বদ্ধতা শুধু আল্লাহর ইবাদত করা নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকেও আল্লাহর নির্দেশিত পথে গড়ে তোলাও। কোরআনের ভাষায় ‘আমিরু বিল মারুফ ও নেহী আনিল মুনকার।’ অর্থঃ সত্যের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান। অথচ তাদের দ্বারা সে দায়িত্বই পালিত হয়নি। সমাজ থেকে দুর্বত্তদের নির্মূল করতে সাহাবাগণ যুদ্ধ করেছেন, প্রাণও দিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের মানুষ সে পাবিত্র লক্ষ্যে বিনা-মেহনতের ভোট দিতেও রাজী নয়। বরং এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভোটে দুর্বৃত্তগণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়, তারা সরকারও গঠন করে। এবং তাদের সে ভোটের কারণে আল্লাহর আইন আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়ে। মুসলমান জনগণের রাজস্বের অর্থে দেশের মানুষকে পথভ্রষ্ট করা হয়। কিন্তু তা নিয়েও জনগণের কাতার থেকে কোন প্রতিবাদ নেই। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে মহিলাদের উপর বর্বর অপরাধগুলো ঘটেছে দুয়েকজন মানুষের সামনে নয়, কয়েক হাজার মানুষের সামনে। কিন্তু কোন অপরাধীদেরকে বাধা দেওয়া বা ঘটনাস্থলে তাদেরকে হাতে নাতে ধরা সম্ভব হয়নি। ফলে কাউকে বিচারের কাঠগড়াতেও তোলা সম্ভব হয়নি। এটি শুধু মুসলমান রূপে ব্যর্থতা নয়, মানবিক দায়িত্বপালনের ব্যর্থতাও। জনগণের এমন ব্যর্থতায় দেশের জন্য শুধু ব্যর্থতার বিশ্ব-রেকর্ডই নির্মিত হয়। বাংলাদেশ কি তেমন আরেক রেকর্ড অর্জনের পথে?
Bookmark this,
|