|
বাংলাদেশে একাত্তরের ঘটনাবলি নিয়ে প্রচুর মিথ্যাচার হয়েছে। বিকৃত হয়েছে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক। লেখা হয়েছে অসত্যে ভরপুর অসংখ্য গ্রন্থ,গল্প,উপন্যাস ও নাটক। নির্মিত হয়েছে বহু ছায়াছবি। এখনও সে বিকৃত ইতিহাস রচনার কাজ চলছে জোরেসোরে। এ পরিকল্পিত মিথ্যাচারের লক্ষ্য একটিই। আর তাহলো,দেশ-বিদেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে সত্যকে আড়াল করা। এবং যারা একাত্তরের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছে তাদের কৃত অপরাধগুলো লুকিয়ে নিজেদেরকে ফেরেশতাতুল্য রূপে জাহির করা। সে সাথে বিরোধী পক্ষকে দানব রূপে চিত্রিত করা। যারা দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করলো,গণতন্ত্রকে পাঠালো নির্বাসনে এবং মানুষকে পাঠালো ডাষ্টবিনের পাশে কুকুরের সাথে উচ্ছিষ্ঠ খোঁজের লড়াইয়ে তাদেরকে আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বলা হচ্ছে বস্তুত সে পরিকল্পনারই অংশ রূপে। এ মিথ্যাচারের আরেক বড় লক্ষ্য,একাত্তরে বাংলার মুসলামানদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী বিভক্তি সৃষ্টি হল,সেটিকে স্থায়ী রূপ দেয়া। বিভক্তিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্যই পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা ছড়ানো হচেছ। এ লক্ষ্যে একাত্তরে দালাল শব্দটির মত অতি বিষপূর্ণ শব্দের প্রয়োগ বাড়ানো হয়েছে। যারাই একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকেই দালাল বলে তীব্র ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এমন ঘৃণা ছড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। তাছিল পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধেকৃত অপরাধগুলোকে জায়েজ করা। আর সে লক্ষ্যে সফলও হয়েছে।
|
|
Read more...
|
|
এ নিয়ে দ্বিমত নেই,পাকিস্তান বহু ক্ষেত্রেই চরম ভাবে ব্যর্থ হয়ছে। কিন্তু সে ব্যর্থতার জন্য দায়ী কি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীরা? সে ব্যর্থতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানীদের কি কোন দায়ভারই নাই? অথচ পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% ভাগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানী। ফলে সকল ব্যর্থতা থেকে দেশকে বাঁচানোর বড় দায়িত্ব ছিল পূর্ব পাকিস্তানীদের। সমগ্র পাকিস্তানের শিক্ষা,শিল্প,কৃষি,বাণিজ্যের অগ্রগতিতে অংশ নেওয়া দূরে এমনকি নিজ প্রদেশের নিজস্ব রাজনীতিতেও তারা ক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের মত পূর্ব পাকিস্তানে চারটি প্রদেশ ছিল না। নানা ভাষাভাষির বিভক্তিও ছিল না। কিন্তু আত্মঘাতি রাজনীতির কারণে নিজের ঘর গোছাতেই তারা চরম ভাবে ব্যর্থ হয়। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধী আওয়ীম লীগ,শেরে বাংলার কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টি,নেজামে ইসলাম পার্টি,গণতন্ত্রি দল ও খেলাফতে রাব্বানী পার্টি ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্ত ভাবে নির্বাচন করে। নির্বাচনে তারা বিপুল ভাবে বিজয় লাভ করে। ২৩৭টি আসনের মধ্যে তারা ২২৮টি আসন তারা লাভ করে। কিন্তু বিজয়ের পর পরই তারা লিপ্ত হয় আত্মঘাতি লড়াইয়ে।
|
|
Read more...
|
|
আওয়াম লীগের নেতৃত্বে যারা আসীন ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তানকে শুরু থেকেই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। যদিও তারা একসময় মুসলিমের লীগের নেতা ছিলেন,পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন এবং মন্ত্রীরূপে পাকিস্তানের সংহতি বহাল রাখার জন্য পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে বা আল্লাহর নামে কসম খেয়েছেন। পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বরাবরই তীব্র ক্ষোভ ছিল। তারা বিশ্বাস করতেন,পাকিস্তান হল ১৯৪০ সালের গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের সাথে গাদ্দারীর ফসল। এ ধরণের নেতাদের সেরূপ মানসিকার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় এ গ্রুপের প্রধান বুদ্ধিজীবী জনাব আবুল মনসুর আহমদের লেখায়। তিনি লিখেছেনঃ “মুসলিম লীগ ৪৬ সালে নির্বাচনে ৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের উপর ভোট নিয়া নির্বাচনে জিতিবার পরে গুরুতর ওয়াদা খেলাফ করিলেনঃ লাহোর প্রস্তাবে বর্ণিত পূর্ব-পশ্চিমে দুই মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের বদলে পশ্চিম-ভিত্তিক এক পাকিস্তান বানাইলেন।”(আবুল মনসুর আহম্মদ,১৯৮৯)। অর্থাৎ তার মতে অতি অপরাধ হয়েছে এক পাকিস্তান বানিয়ে। পাকিস্তানকে বলেছেন পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক পাকিস্তান। পাকিস্তান-এর প্রতি এ গভীর বীতশ্রদ্ধা নিয়ে কেঊ কি সে দেশের মঙ্গল করতে পারে। অথচ আবুল মনসুর আহম্মদ সাহেব নিজে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হয়েছেন। কথা হল, তারা যে মন্ত্রী হয়েছেন সেটি কি নিছক ক্ষমতার মোহে ও আখের গুছানোর তাগিদে?
|
|
Read more...
|
|
স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে শেখ মুজিব ও অন্যান্য আওয়ামী লীগের নেতাদর দলীল হল,১৯৭০ -এর নির্বাচনে তাদের বিজয়। অথচ জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হতে। এবং সেটি অখন্ড পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সংকট দুর করার লক্ষ্যে,দেশটি বিভক্ত করতে নয়। কিন্তু যে জন্য জনগণ তাদেরকে ভোট দিল সে দায়িত্ব তারা পালন করেননি। পাকিস্তানের খেদমত না করে,দেশটিকই তারা ভেঙ্গে ফেলল। অথচ নির্বাচন কালে দেশটি ভাঙ্গার কথা বলে তারা জনগণ থেকে ভোট নেননি। এটি ছিল তাদের উপর অর্পিত আমানতের খেয়ানত। অথচ এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষযে রায় দেওয়ার অধিকার ছিল একমাত্র জনগনের। যে কোন সভ্য দেশে এমন বিষয়ে বিপুল আয়োজনে জনমত যাচাই বা রেফারেন্ডাম হয়। রাজনৈতিক ময়দানে তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা হয়। উপমহাদেশেও এমন একটি রিফারেন্ডাম হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। সেটি ভারত ভাঙ্গার পক্ষে রায় যাচায়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে রিফারেন্ডামের ভিত্তিতেই। তখন বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেয়। এদেশটির বিলুপ্তি হতে পারত একমাত্র আরেকটি অনুরূপ রায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু তা হয়নি।
|
|
Read more...
|
|
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতা নিয়ে বহু লেখা হয়েছে, বহু ছায়াছবিও নির্মিত হয়েছে। কিন্তু যাদেরকে বাঙ্গালীর হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বলা হচেছ তাদের দ্বারা যে নৃশংস হত্যাকান্ডগুলো ঘটেছে সে বিররণও কি সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে? অথচ এটিও তো ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। এটুকু না জানলে বাঙ্গালীর ইতিহাসের পাঠই যথার্থ ও পূর্ণাঙ্গ হবে না। দেখা যাক তাদের কান্ডটি। ১৯৭১য়ের ২৬শে কুষ্টিয়ার মত একটি মফস্বল শহর আওয়ামী ক্যাডারগণ কতটা হিংস্র রূপ ধারণ করেছিল তার বর্ণনা একজন প্রত্যক্ষ্যদর্শি দিয়েছেন এভাবে,’উর্দুভাষী এডিশনাল ডিপুটি কমিশনার ও মিউনিসিপ্যালটির ভাইস চেয়ারম্যানকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা মিছিল বের করে লাশ দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে মহাউল্লাসে শহর প্রদক্ষিণ করল। উর্দুভাষীদের দোকানপাট লুট ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় হিন্দু সাংবাদিক ও সামরিক বাহিনীর অফিসারদের শহরে আনাগোনা দেখে বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না যে দু দেশের মানচিত্রে যে সীমারেখা ছিল তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।-(সা’দ আহম্মদ, ২০০৬)’
|
|
Read more...
|
|
|
একাত্তরের আত্মঘাতের ইতিহাস
|
|
এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে একাত্তরের লড়াইয়ে বিস্তর রক্তক্ষয় হয়েছে,কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস রচনাকারিদের হাতে যেটি মারা গেছে সেটি হল সত্য ও ন্যায়বিচার। একাত্তরের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা। বিজয়ের পর তারা শধু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনই দখলে নেয়নি,দখলে নিয়েছে ইতিহাস রচনার ন্যায় এ্যাকাডিমিক বিষয়ও। আওয়ামী শাসনামলে সরকারি অর্থে সরাকরি লোকদের লাগানো হয়েছিল ইতিহাস রচনার কাজে। ফলে যা রচনা হয়েছে তার অনেকটাই আর নিরেপক্ষ ইতিহাস থাকেনি। খুঁটিনাটি বিষয় দুরে থাক,তাদের পেশ করা প্রধান প্রধান তথ্যগুলো যে কতটা অসত্য সে প্রমাণ কি কম? লেখা হয়েছে,পাক-বাহিনী একাত্তরে তিরিশ লাখ বাঙ্গালীকে হত্যা করেছিল। হুশজ্ঞান ও বু্দ্ধিবিবেচনা আছে এমন ব্যক্তিকে দিয়ে এ তথ্য কি বিশ্বাস করানো যায়? তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে,তিরিশ লাখ মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনে মারা যেতে হয় একজনকে। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে।
|
|
Read more...
|
|
সমগ্র উপমহাদেশে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বুদ্ধিবৃত্তি সর্বক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল বাঙালী মুসলমানেরা। বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ এসব প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগের বেশী ছিল না কিন্তু তারা শিক্ষাদীক্ষায় হিন্দুদের চেয়ে অগ্রসর ছিল। বাংলায় মুষ্টিমেয় যে ক’জন লেখাপড়া শিখছিল তাদের পক্ষে প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগীতা করে চাকুরিতে ঢুকা সহজ ছিল না। সহজ ছিল না ব্যবসা-বাণিজ্যে সামনে এগুনো। পূর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত অগ্রসর হিন্দুরা তাদের জন্য সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে রাজী ছিল না।চিত্তরঞ্জন দাশ একবার চাকুরিতে মুসলমানদের জন্য সংখ্যানুপাতে বরাদ্দের কথা বলেছিলেন, কিন্তু বর্ণহিন্দুরা তার সে প্রস্তাব তৎক্ষনাৎ নাকোচ করে দেয়।আজকের ভারতে আজও তারা দিচ্ছে না।ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ হলে কি হবে,সরকারি চাকুরিতে শতকরা ২ ভাগও তারা নয়।ফলে ভারতের মুসলমানগণ আজ সেদেশের নমশুদ্র বা হরিজনদের থেকেও পশ্চাদপদ।এবং সে ঘোষনাটি এসেছে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কর্তৃক স্থাপিত এক তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে।
|
|
Read more...
|
|
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে মূল দর্শন ও যুক্তিটা ছিল দ্বি-জাতি তত্ত্ব। যার মূল কথা,মুসলমানগণ হিন্দুদের থেকে এক পৃথক জাতি। তাদের নাম ও নামকরণ পদ্ধতিই শুধু আলাদা নয়,আলাদা হল তাদের জীবন-লক্ষ্য,তাহজিব তামুদ্দন,ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এ জীবনে সফলতা ও বিফলতা যাচায়ের মানদন্ড। মুসলমান ও হিন্দু -এ দুইটি জাতি যেমন এক লক্ষ্যে বাঁচে না,তেমনি একই লক্ষ্যে রাজনীতিও করে না। মুসলমানের বাঁচবার মূল লক্ষ্যটি হল,সর্বকাজে আল্লাহকে খুশি করা। এ জন্যই ভিন্ন হল,মুসলমানের রাজনৈতিক এজেন্ডাও। এবং সে এজেন্ডাটি হল আল্লাহর দ্বীন তথা বিধানকে সর্বস্তরে বিজয়ী করা। এজন্যই রাজনীতি তার কাছে কোন নেশা নয়,পেশাও নয়।বরং ইবাদত। এটি জ্বিহাদ। আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করতে গিয়ে নবীজী (সাঃ)কে ৫০-এর বেশী যুদ্ধ করতে হয়েছে। তাই শুধু নামাযা-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করলেই পরিপূর্ণ ইবাদত হয় না। তাকে জীবনের প্রতি মুহুর্ত ও প্রতি ক্ষেত্রকে আল্লাহর অনুগত করে দিতে হয়। কোরআনের বিধান তাই শুধু মসজিদে পালন করলে চলে না, সে বিধানকে রাষ্ট্র-পরিচালনা, বিচার-আচার ও শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিয়ে আসতে হয়। প্রতিকর্মে মেনে চলতে হয় আল্লাহর বিধানকেও। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলি যেরূপ অমুসলিমদের সাথে একত্রে চলে না, তেমনি চলে না তার রাজনৈতিক ইবাদতও।
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরের রক্তপাত হয়েছিল তিনটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়টি শুরু হয় আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের কর্মী বাহিনীর হাতে। কথা ছিল, ১৯৭১এ মার্চের তিন তারিখে জাতীয় সংসদের বৈঠক বসবে ঢাকায়। ইয়াহিয়া খানের সরকার চাচ্ছিল সংসদে বৈঠক বসার আগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে নেতাদের মাঝে কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত্য হোক। কিন্তু তা হয়নি। সেটি অসম্ভব হয়ে পড়েছিল ভুট্টো ও মুজিবের আপোষহীন মনভাবের কারণে। নির্বাচনে বিজয়ের পরই আওয়ামী লীগের ছাত্রফ্রন্ট ছাত্রলীগ ইতিমধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বানিয়ে তা দেশজুড়ে লটকানোর ব্যবস্থা করেছিল। প্রচন্ড প্রস্তুতি চলছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার এবং সে লক্ষ্যে একটি প্রচন্ড যুদ্ধের। ১৯৭০এর নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের মূল দায়িত্ব ছিল একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা ছিল না। ফলে ভূট্টো, ইয়াহিয়া খান বা পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতাদের সাথে তাদের আলোচনায় তাদের সামান্যই আগ্রহ ছিল। মুজিব তার অবস্থানে অনড় থেকে দিনের পর দিন আলোচনায় বসছিল। বিফল আলোচনার দায়ভার চাপাচ্ছিল সরকারের উপর। অপর দিকে সে সময় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ক্যাডাররা দেশজুড়ে অতিদ্রুত সংঘটিত হচ্ছিল এবং সে সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও নিচ্ছিল।
|
|
Read more...
|
|
বহু ভিত্তিহীন মিথ্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় আরেক মিথ্যাচার হয়েছে মুক্তিবাহিনীর অবদান নিয়ে। এ নিয়ে কোন বিরোধ নেই যে, মুক্তিবাহিনীর বহু হাজার সদস্য ভারতে গিয়েছিল এবং সেখানে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গুপ্তচর সংস্থা র’এর প্রশিক্ষকদের থেকে ট্রেনিং নিয়েছিল। ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশের ভিতরে তারা বহু লড়াই এবং বহু নাশকতা তৎপরতাও চালিয়েছে। এ নিয়েও বিরোধ নেই যে, আওয়ামী লীগের কর্মীদের নিয়ে স্বাধীন বাংলা মুক্তিফৌজ নামে একটি গুপ্ত সংগঠন ষাটের দশক থেকেই ভারতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। তারা বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত হামলা চালিয়েছিল এবং এসব হামলায় অনেকে প্রাণও হারিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের পরাজয় ও বাংলাদেশের সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা কতটুকু? মুক্তিবাহিনীর দাবী,স্বাধীন বাংলাদেশ তাদেরই সৃষ্টি। এ যুক্তিতে ভারতের ভূমিকাকে পাদটিকায় পাঠানো হয়েছে।এ কথাটি প্রমানের চেষ্টা হয়েছে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেও। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি প্রতি বছর এ কথাটিই তারা বার বার বলে ১৬ই ডিসেম্বরে।এ কথা বলে, নিছক নিজেদের ভাবমূর্তিটাকে বড় করে তুলে ধরার লক্ষ্যে। এটি সত্য যে,মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করেছিল ৯ মাস। এ ৯ মাসে ভারত তাদের সর্বাত্মক সামরিক ও বেসামরিক জুগিয়েছিল।
|
|
Read more...
|
|
|
পুলিশ,উকিল বা বিচারকের ভূমিকায় নামা ইতিহাসের লেখকের কাজ নয়। ঘটনা ঘটে যায়। সে ঘটনার পক্ষ-বিপক্ষের নিরপেক্ষ বিচারের দায়ভার প্রতিটি ব্যক্তির। যিনি ইতিহাস লেখেন তার দায়িত্ব,সে বিচারকার্যে ব্যক্তিকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে সাহায্য করা। কিন্তু বাংলাদেশে ইতিহাস লেখকদের বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে বড় অপরাধ হল, পাঠকের সামনে নিরপেক্ষ তথ্য তুলে ধরতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। বরং নিজেরাই বাদী,নিজেরাই পুলিশ,সরকারি উকিল ও সরকারি ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকায় নেমেছেন। মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে ঘটনার বিচারে জনগণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। তারা এক পক্ষের প্রচন্ড গুণকীর্তন ও অপর পক্ষের চরিত্রহনন করেছে। ইতিহাসের বিচার প্রত্যেকের কাছেই ভিন্ন ভিন্ন। কারণ,এখানে কাজ করে ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তা-চেতনার মডেল। তাই একই ঘটনার রায় ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্নতর হয়। হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপের পর এক পক্ষের কাছে সেটি শুধু ন্যয্য নয়,উৎসবযোগ্যও গণ্য হয়েছে। ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন যৌথ আগ্রাসন,হত্যা ও বোমাবর্ষণ ইরাকীদের কাছে যত নিষ্ঠুরই হোক,মার্কিন যুক্তরাষ্ট,ব্রিটেন ও তাদের মিত্রদের কাছে গণ্য হচ্ছে সভ্যতা ও গণতন্ত্রের নির্মাণে অতি মহৎ কর্ম রূপে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ব্লেয়ারের এ নিয়ে কত অহংকার! এমন হত্যাকান্ডে নিয়োজিত নিজ দেশের নিহত যোদ্ধাদেরকে তারা জাতীয় বীর মনে করে।
|
|
Read more...
|
|
পাকিস্তানের ব্যর্থতার জন্য শুধু দেশটির শত্রুরাই দায়ী নয়,দায়ী মিত্র বা শুভাকাঙ্খীরাও। পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থিদের রাজনীতিও কি কম আত্মঘাতি? রোগী অনেক সময় মারা যায় রোগের কারণে নয়,চিকিৎস্যকের ভূল চিকিৎসার কারণে। পাকিস্তানের ক্ষতিটা হয়েছে দুই পক্ষ থেকেই। পাকিস্তানের মূলে সর্ব প্রথম যে কুড়ালটি আঘাত হানে তা হল ভাষা আন্দোলন। আন্দোলন শুরু করে তমুদ্দন মজলিসের মত একটি সংগঠন যা দেশে মুসলিম তাহজিব ও তামুদ্দনের কথা বলে। ইসলামি চেতনার কথাও বলে।কথা হল,আন্দোলনের জন্য দিন-ক্ষণ কি যথার্থ ছিল? শত্রুর ষড়যন্ত্রের শিকার পাকিস্তান তার ক্ষতবিক্ষত-জিন্নাহর ভাষায় পোকায় খাওয়া-দেহ নিয়ে সবে মাত্র যাত্রা শুরু করেছে,তখনও দেশটি নিজের ঘর গুছিয়ে নিতে পারিনি।সমাধান হয়নি দেশের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার। ওদিকে মরণ কামড় দিতে ওঁত পেতে বসে ছিল প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্রটি।আর তখনই শুরু হল এ বিশাল আন্দোলন।রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি গুরুতর,বিশ্বের বহু দেশে এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে চিন্তাভাবনা হয়।রাজপথ উত্তপ্ত না করে এক উত্তেজনামূক্ত পরিবেশে দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এ নিয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা করেন,নিজেদের মাঝে মতের আদান প্রদানও করেন।
|
|
Read more...
|
|
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নবাদের পরিকল্পনা হয় ভারতে। এ ব্যাপারে শুধু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’এর কর্মকর্তারারই শুধু মুখ খুলেনি, মুখ খুলেছে বাংলাদেশের বহু নেতাও। যেমন এক কালের নেতা ও পরবর্তীতে জাতীয় লীগ নেতা জনাব অলি আহাদ বলেন,“১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থানকালে ময়মনসিংহ নিবাসী রাজবন্দীদ্বয় আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ও আবু সৈয়দের নিকট হইতে আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিষয়াদী অবগত হই। ভারতে মুদ্রিত বিচ্ছিন্নতাবাদ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ময়মনসিংহ ও বিভিন্ন জেলায় বিতরণকালেই তাহারা গ্রেফতার হইয়াছিলেন।”-(অলি আহাদ)। ইতিহাসের নামে যে মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে তা হল, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশের সৃষ্টি মূলতঃ মুক্তিবাহিনীর অবদান। ভারতের নাম তারা সহজে মুখে আনতে চায় না। ইতিহাসের পাঠ্য পুস্তকে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডারগণ কে কথায় লড়াই করেছেন সে বিবরণ থাকলেও ভারতীয় বাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য কোথায় কি ভাবে যুদ্ধ করলো তার সামান্য বিবরণও নেই। বিবরণ নেই ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীর ভূমিকার। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে কোন উল্লেখ সে যুদ্ধে কতজন ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। মুক্তিবাহিনীর অবদান অবশ্যই আছে, তবে তারাই মূল নয়।
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরকে ঘিরে আওয়ামী লীগের বড় অস্ত্র ছিল মিথ্যাচার। সে সাথে ছিল হৃদয়হীন সন্ত্রাস। এটি যে শুধু দলটির নীচের তলার ক্যাডার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, দলের শীর্ষ নেতা, আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক - সবার মধ্যেই সেটি ভয়ানক ভাবে প্রবেশ করেছিল। এর কিছূ উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৭০ সালের ১৮ ই জানুয়ারীতে পল্টনে জামায়াতে ইসলামির জনসভা ছিল। সেখানে দলটির আমীর মাওলানা মাওদূদী ছিলেন প্রধান বক্তা। কিন্তু জনসভায় তার আগমনের আগেই প্রচন্ড হামলা শুরু হয়। সেদিন সে হামলা লেখক স্বচক্ষে দেখেছেন। না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন হত, গণতন্ত্রের দাবীদার একটি দল অন্য দলের শান্তিপূর্ণ জনসভার উপর কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। হামলার জন্য প্রচুর ভাঙ্গা ইট জমা করা হয়েছিল জিন্নাহ এভিনিউতে যা আজ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ নামে পরিচিত। আওয়ামী ক্যাডারগণ বৃষ্টির মত ছুঁড়ে মারছিল জনসভায় সমবেত শ্রোতাদের উপর। মিনিটের মধ্যেই শত শত মানুষ আহত হল। পাথরের আঘাতে মাথা ফেটে রক্ত বেরুচ্ছিল অনেকেরই।জনসভাটি বিশাল করার লক্ষ্যে জামায়াত সারা দেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থক নিয়ে জমা করেছিল। মফস্বলের সাদামাটা মানুষগুলো তখন পাথর খেয়ে দিশে হারা হয়ে গিয়েছিল,নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে কোথায় যে পালাবে সে রাস্তাও পাচ্ছিল না।
|
|
Read more...
|
|
অনেকেরই যুক্তি, একাত্তরে পাকিস্তানের সমর্থন করার অর্থ ছিল জালেমের সমর্থন করা। তাদের প্রশ্ন,এমন জালেমকে সমর্থন করা কি ইসলামসম্মত? তাদের কথা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যেহেতু জালেম, দেশটিকে তাই আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না। ফলে তারা সর্বশক্তি বিনিয়োগ করে পাকিস্তানের বিনাশে। এ যুক্তিতে ইসলামের শত্রুশক্তি বা কাফের শক্তির সাথে জোট বাঁধাটাও তাদের কাছে আদৌ দোষের মনে হয়নি। ফলে তারা ভারতকে ডেকে আনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সাদ্দাম হোসেন অতি জালেম -এ যুক্তি দেখিয়ে একই ভাবে ইরাকের মার্কিন তাঁবেদার পক্ষটি নিজ দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে অনিবার্য করে তোলে। এভাবে তারা ত্বরান্বিত করে দেশটির সর্বাত্মক ধ্বংসের কাজ। জালেম হটানোর এমন হটকারি উদ্যোগে ইতিমধ্যেই দেশটির ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। পঙ্গু হয়েছে ১০ লাখেরও বেশী। উদ্বাস্তুর বেশে দেশে-বিদেশে ঘুরছে প্রায় ৩০ লাখ। ফালুজার মত বহু শহর মাটিতে মিশে গেছে। এখনও সে বিনাশকর্ম পুরাদমে চলছে। কোন ঘরেই বিষাক্ত সাপের প্রবেশ অস্বাভাবিক নয়। তবে আহাম্মকি হল সে সাপের কারণে ঘরে আগুন দেওয়া। অথচ ধৈর্য ধরলে হয়ত বিষাক্ত সাপটি নিজে নিজেই সরে যেতে পারে। না সরলে সে সাপটিকে মারা যেতে পারে।
|
|
Read more...
|
|