Bookmark and Share
Home শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম মিডিয়া আগ্রাসনের মুখে মুসলিম বিশ্ব

eBook Collection

Latest Comments

সর্বাধিক পঠিত

মিডিয়া আগ্রাসনের মুখে মুসলিম বিশ্ব Print E-mail

ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব আজ যে আগ্রাসনের শিকার সেটি শুধু সামরিক নয়, বরং প্রবলতর হল মিডিয়া ক্ষেত্রে। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিডিয়া আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যে যেমন ইসরাইল, সমগ্র বিশ্বজুড়ে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র, দক্ষিণ এশিয়ায় তেমনি ভারত। ভারতীয় প্রচারের কৌশল দ্বিমুখী। ভারত থেকে সরাসরি সম্প্রচারের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে তাদের আশ্রয়ে পালিত হচ্ছে মিডিয়া জগতের অনেকেই। প্রতিবেশী দেশের রাজনীতি ও ভূগোলকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে ভারতীয় পুঁজির বিস্তর বিনিয়োগ হয়েছে মূলতঃ সাতচল্লিশ থেকেই। তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ১৯৬৫-এর সামরিক আগ্রাসন ভন্ডুল হওয়ার পর তাদের প্রচারধর্মী নিরস্ত্র আগ্রাসনের মাত্রা বহুগুনে বেড়ে যায়। আকাশবাণীর বহু কেন্দ্র স্থাপিত হয় তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানকে টার্গেট করে, প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক নতুন টিভিকেন্দ্র। একাত্তরের পর থেকে শুরু হয় ভারতীয় বই-পুস্তকের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। এখন অবস্থা এমন যে, কলকাতার বই-পুস্তকের প্রচার সংখ্যা বহু বাংলাদেশী বইয়ের চেয়েও অধিক।

তাছাড়া ভারতীয় আধিপত্য সহনীয়, গ্রহণযোগ্য, এমনকি প্রশংসনীয় করতে বহু পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। এদেশটিকে কবজায় রাখতে গিয়ে এককালে নিজেদের বুকের রক্ত ব্যয় করেছিল বৃটিশরা, লক্ষ্য ছিল বাজার দখল। ভারত একই উদ্দেশ্য সাধন করছে নিজেদের রক্তক্ষয় না করেই।একাজটি সারছে কিছূ অর্থব্যয় করেই। বৃটিশের সামনে সমস্যা ছিল, এত অধিক হারে তারা এত আত্মবিক্রীত দালাল পায়নি। ফলে তিতুমীর, দুদুমিয়া আর ফকির মোজাহিদদের বিরুদ্ধে তাদের নিজেদেরকেও রক্ত ঢেলে লড়তে হয়েছে। অথচ ভারতের সৌভাগ্য হল, তাদের লড়াই আজ এদেশের অনেকে লড়ছে। এর কারণ, তাদের প্রবল প্রচার আগ্রাসন। তাদের প্রচারের ফসল এদেশে যে ফলেছে প্রচুর এটি তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। বাংলাদেশী হয়েও এরা ভারতীয়দের চেয়েও বেশি ভারতীয়। তসলিমা নাসরীন হল এ ক্ষেতেরই ফসল। সে যা লিখেছে তা খুব কম সংখ্যক ভারতীয়ই লেখার সাহস করেছে। এজন্য সে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হলেও ভারতে পুরস্কৃত হয়েছে। সে যে তাদেরই লোক ভারতীয় পুরস্কার অন্ততঃ সেটিই প্রমাণ করেছে। তসলিমা নাসরীনের মত সাহস না থাকলেও মন-মানসিকতায় তার মত অভিন্ন লেখকের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নয়, বরং অসংখ্য। এক ও অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে তারা। সে অভিন্ন লক্ষ্যটি হল, সাতচল্লিশের ভারত বিভাগ বাংলাদেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ছিল সেটি আদাজল খেয়ে প্রমাণ করা। আর এটি প্রমাণিত করতে পারলে বাংলাদেশের পৃথক অস্তিত্বকে অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ করাও তাদের জন্য সহজতর হবে। বাংলাদেশের শেকড় কাটার কাজ এবং সে সাথে ভারতের দেহে ম্লান হওয়ার পক্ষে প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হচ্ছে বস্তুতঃ এভাবেই। অখন্ড ভারতে একীভূত হওয়ার দাবী তারা এ মুহুর্তে না উঠালেও যথা সময়ে যে উঠাবে সেটি সুনিশ্চিত। নইলে ভারত ঘেষা এসব বুদ্ধিজীবীদের এত কসরৎ কেন? এ কাজের শুরু সাতচল্লিশ থেকে, একাত্তরে তারা একটি ধাপ অতিক্রম করেছে মাত্র। তবে এটাই যে শেষ ধাপ নয় সেটি সুস্পষ্ট ধরা পরে এদের লেখনীতে। সাতচল্লিশের ভারত বিভাগের বিপক্ষে এ পক্ষেরই লেখকদের মনে ঘৃণা যে কত তীব্র ও বিষাক্ত তা কখনোই গোপন থাকেনি।

 

অত্যাধিক ঘৃণার আসক্তিতে মানুষের বিবেক স্বভাবতই সুস্থ্যতা হারায়, বিবেকের অসুস্থ্যতায় ডাহা মিথ্যা অনর্গল বলাটাও তখন অপরাধ বলে মনে হয় না। তখন আপত্তি থাকে না অন্য আর দশটি পণ্যের ন্যায় বিবেককে বাজারে তুলতেও। এ চেতনাতেই শ্রমিক যেমন শ্রমজীবি এরাও তেমনি বুদ্ধিজীবি। তসলিমা নাসরীনের ন্যায় এমনই এক অতি ব্যস্ত বুদ্ধিজীবি হলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। তসলিমা নাসরীনের ন্যায় সাহসী না হলেও তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যে অভিন্ন তা আর অস্পষ্টও নয়। তিনি থাকেন লন্ডনে, ইউরোপে তসলিমার সাথে তার যে যোগাযোগ আছে সেটি তার লেখনিতে উল্লেখও করেছেন। বিভুরঞ্জন সরকার সম্পাদিত "চলতি পত্র”-এর ১৯৯৭ সালের ৫ ই মে সংখ্যায় তিনি এক মজাদার গল্প ফেঁদেছেন। গল্পটি বলেছেন একথা প্রমাণ করতে যে, সাতচল্লিশের দেশ-বিভাগ সাধারণ মানুষের অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ করে না। উল্লেখ্য তার এ দেশ বিভাগ হল সাতচল্লিশের। গল্পটি হল এরুপ, ষাটের দশকে লেখক পুরোন ঢাকার কোন এক গলিতে থাকতেন। তার বাসায় ঝোলায় করে নিয়মিত শাড়ী বিক্রি করতে আসতেন এক বৃদ্ধ মুসলমান। একদিন ব্যবসার কথা জিজ্ঞাস করায় তিনি বল্লেন, "দেশ ভাগ হয়ে গেছে। আমরাও মরে গেছি। আগে এই শাড়ীর বোঝা মাথায় নিয়ে সারা ভারত ঘুরে বেড়াতাম। দিল্লি, বোম্বাই, আগ্রা ঘুরে বেড়াতাম .... এলাহাবাদে গিয়ে কাপড় বিক্রি করেছি। ইন্দিরা গান্ধী, বিজয় লক্ষী পন্ডিতের কাছে তাদের এলাহাবাদের বাড়িতে গিয়ে শাড়ী বেঁচেছি। তারা শুধু কাপড় কিনতেন না, সারাদিন মাথায় বোঝা নিয়ে শহরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হলে নেহেরু সাহেবের বাড়ীতে যেতাম। বাড়ীর মা লক্ষীরা আমাকে নিজ হাতে খেতে দিতেন।” অবশেষে তিনি বলেছেন, কেউ কেউ হয়তো বুড়োর এ গল্প বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু আমি করেছিলাম।” যদিও এ গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা সামান্যই, তবে গুরুতর বিষয় রয়েছে গল্পের বাহিরে লেখকের নিজের কথাতেই। তিনি নিজের কথা বলেছেন এ বলে যে দেশ বিভাগ মানুষের অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ করে না। এ কথাটি বলেছেন তিনি সাতচল্লিশের ক্ষেত্রে। অথচ একই কথা এদেশের এক পক্ষ বলেছিল একাত্তরে। অতএব একথা বলে তিনি কি বুঝাতে চান, একাত্তরের পাকিস্তান বিভাগও অকল্যাণকর ছিল? তাহলে পাকিস্তানপন্থীদের ভ্রান্তি কোথায়? তার কথাটি সত্য হলে রাজাকারদের বিরুদ্ধে নিন্দাবাদের যৌক্তিকতার ভিত্তি থাকে কী? কারণ তারাও তো একই কথা বলেছিল একাত্তরে। এরপর ঐ বৃদ্ধের বক্তব্যকে দলিল মেনে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে ভারত বিভক্তির ফলে এদেশবাসীর কোন কল্যাণই হয়নি। ইনিয়ে বিনিয়ে এ প্রবন্ধে তিনি এই চরম অসত্য বক্তব্যটি বুঝাতে চেয়েছেন। ইচ্ছা করেই এসব ভারতভক্ত বুদ্ধিজীবি বুঝতে চাইবেন না যে এদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে সব চেয়ে বড় কল্যাণকর ঘটনাটি হল ভারত বিভক্তি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ বিভক্তির কল্যাণ দেখে এ পথে পা বাড়াচ্ছে ভারতের আরো অনেক প্রদেশই। আজকের বাংলাদেশ, রাষ্ট্র ভাষা বাংলা, রাজধানী ঢাকা এসবতো ভারত বিভক্তিরই অবদান।


সাতচল্লিশের পাকিস্তান সৃষ্টি যে এ এলাকার মুসলমানদের সামনে এক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির দুয়ার খুলে দেয় সেটি প্রমাণের জন্য গবেষনার কি প্রয়োজন আছে? বিভাগপূর্ব ভারতে বাংলায় কোন মুসলিম শিল্পপতি ছিল না। যে কয়েকখানা কল-কারখানা ছিল তার সবগুলোর মালিক ছিল অমুসলিমরা। অতি অল্প বেতনে মজদুরী ছাড়া সে সব কলকারখানায় মুসলমানদের ভাল চাকুরীও মিলত না। অধিকাংশ জমিদার ছিল হিন্দু, মুসলমান ছিল দরিদ্র কৃষক। ডঃ আহম্মদ শরীফের মতে "সাতচল্লিশ পূর্বে অবিভক্ত বাংলার ২৮টি জেলায় মুসলমানদের ২৮টি বিল্ডিং ছিল না।” এমনটি বললে যদিও বেশী বলা হয় তবে প্রতি এক লাখের মাঝে একজন মুসলমানেরও যে সে সময় বিল্ডিং ছিল না তাতে সন্দেহ নেই। বেশীর ভাগের বাস ছিল খড়ের ঝুপড়িতে, বড়জোর টিনের ঘরে। কিন্তু আজ বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি, পাকিস্তানেও প্রায় ১৬ কোটি। অপরদিকে সরকারী হিসাব মতে ভারতে মুসলমানের সংখ্যা ১৬ কোটির উর্দ্ধে, বেসরকারী মতে প্রায় ২০ কোটি। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যে কোন দেশের চেয়ে অধিক মুসলমানের বাস ভারতে। অথচ একমাত্র ঢাকা শহরে যত মুসলিম ব্যবসায়ী, ডাক্তার-প্রকৌশলি, অধ্যাপক-এডভোকেটের বসবাস সমগ্র ভারতের ১৬ কোটি মুসলমানও তা তৈরী করতে পারেনি। শুধুমাত্র করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদের মত এই তিনটি শহরে মুসলমানদের যত সুরম্য ঘরবাড়ী, কলকারখানা ও সম্পদ গড়ে উঠেছে সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের তা নেই এমনকি তার সিকিভাগও নেই। সমগ্র পাকিস্তানের অন্যান্য নগর-বন্দর তো বাদই রইলো। পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে গ্রামের ছেড়া মাদুড়-কাঁথায় গড়াগড়ি যাওয়া ছেড়া লুঙ্গিপড়া ছেলেদের অনেকেই যে আজ সুরম্য অট্টালিকা, বিশাল ব্যবসা সংস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ী এবং আরো অনেক কিছুরই মালিক হয়েছে সেটি অস্বীকারের উপায় আছে কি? অথচ ১০০ বছর পূর্বের বৃটিশ ভারতে মুসলমানেরা যে অবস্থায় ছিল এখনকার অবস্থা বরং তার চেয়েও খারাপ। আজও তারা মুট টানছে অথবা কারখানায় মজদুরী করছে, যেমনটি করেছে বিভাগপূর্ব কালে। সে সাথে ক্ষনে ক্ষনে শিকার হচ্ছে বিভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। অতি পশ্চাদপদ পাকিস্তানভুক্ত এলাকায় মুসলমানদের এই যে উন্নতি- আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মত ভারতভক্ত বুদ্ধিজীবীরা তা দেখতে পাননা। এত কিছু না দেখে তিনি অবশ্য দেখতে পেয়েছেন একজন ঝোলাওয়ালা কিভাবে নিঃস্ব হল সেটি। এতেই প্রমাণিত হয় তাদের বিবেকহীনতা কতটা গভীর ও গুরুতর। গায়ে অত্যধিক জ্বর উঠলেও নিজ ঘরে শুয়েও বাড়ী যাবো’ বলে চিৎকার করা অস্বাভাবিক নয়। এতে বুঝা যায় রোগীর শারীরিক অসুস্থ্যতা কতটা তীব্র। তেমনি বিবেকহীনতা তীব্রতর হলে স্বাধীনতা তখন পরাধীনতা মনে হয়। মুসলমানের কল্যাণও তখন অকল্যাণ মনে হয়।


এমন মিথ্যা প্রচারের অতি সুক্ষ লক্ষ্যটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বুকে যুক্তিহীন করা। এ লক্ষ্যেই বিভুরঞ্জন সরকারেরা স্বনামে ও বেনামে বাংলাদেশে প্রচুর পত্রিকা বের করেছেন। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ন্যায় কৌশলী লেখকও পেয়েছেন। পয়সার জোরে জঘন্য অপরাধীও আদালতে অভিজ্ঞ উকিল পেয়ে যায়, তেমনি এসব প্রকাশকেরাও পেয়ে যায় পেশাদার লেখক। আব্দুল গাফফার চৌধুরীরা এ কাজে নিঃসঙ্গ নন, বরং অসংখ্যদের মাঝে একজন। মানব ইতিহাসের গোয়েবেলসরা চীরকাল যেভাবে হিটলারের হাতে ধরা দিয়েছে, এরাও সেভাবে সজ্ঞানে ধরা দিয়েছে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে। এরাই হল এদেশে বিদেশের 'His Master's Voice'। এদের মত মেধা বিক্রয়ে যারা দু'পায়ে খাড়া, যুগে যুগে তারাই বিদেশী ক্রেতা খুঁজেছে। তাদের কারণেই ভারতীয় আধিপত্যের বাজার এ দেশে এতটা রমরমা। এ অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাসী তাদের দায়িত্ব অপরিসীম। বুঝতে হবে প্রচার থেকেই প্রভাবিত হয় রাজনীতি এবং রাজনীতি থেকেই নির্ধারিত হয় জাতীয় স্বাধীনতা ও ইতিহাস। তাই এদের অপপ্রচারে মানুষের চেতনার শেকড় বিনষ্ট হলে এদেশের স্বাধীন ভূগোলেরও আর অস্তিত্ব থাকবে না। তখন পরাধীনতা অনায়াসেই গ্রাস করবে এর সকল অস্তিত্বকে।


আধিপত্য বিস্তারে যুদ্ধ জয় এক সময় অপরিহার্য ছিল এবং সেটি ছিল মূলতঃ তিনটি কারণে, এক) অর্থনৈতিক আধিপত্য, এর মধ্য দিয়ে ঘটে বিজিত দেশে অর্থনৈতিক লুটপাট, বাজার দখল ও রাজস্ব আয়, দুই) রাজনৈতিক প্রভূত্ব, তিন) আদর্শিক বিজয় এর লক্ষ্য শত্রুর চেতনায় পঙ্গুত্বসাধন, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, নৈতিক বিপর্যয়সাধন ও এভাবে শত্রুর পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা রোধ। কিন্তু এখন যুদ্ধ ছাড়াও এসব সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির ফলে প্রচারের সামর্থ্য এখন প্রচুর, কোন দেশের সীমানাই আজ আর অগম্য বা দুর্গম্য নয়। সুউচ্চ পর্বত বা বিস্তৃত মহাসাগর -কোনকিছুই প্রচারের কাছে অনতিক্রম্য নয়। বিশ্বের ঘরে ঘরে যা কিছু বলার তা এখন অনায়াসেই বলা যায়, বাহিরের কথা ঘরে প্রবেশের এখন আর কোন বাধাই নেই। কিন্তু মুসলমানদের সমস্যা হল একাজে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য এর কোনটিই তাদের নেই। শত্রুরা যখন এ ময়দানে বীরদর্পে খেলছে সেখানে তারা নিরব দর্শক বৈ নয়। প্রচার মাধ্যমের সিংহভাগই এখন অমুসলিমদের দখলে। ফলে মুসলমানেরা কি শুনবে বা দেখবে সেটিও এখন অন্যের নিয়ন্ত্রণে। চিন্তার দূষিতকরণে প্রচারযন্ত্রের চেয়ে সফল মাধ্যম আর নেই, নিরেট মিথ্যাও সত্যরুপে প্রতিষ্ঠা পায় প্রচারের ফলে। প্রযুক্তির বদৌলতে শত্রুর লাউডস্পিকার এখন ঘরে ঘরে, এমনকি বেডরুমেও। অনাকাঙ্খিত শত্রুও সেখানে সর্বময় সোচ্চার। ফলে সংকট বেড়েছে মুসলমানদের মুসলমান থাকা নিয়েই। শত্রুর প্রচারের বানে আদর্শিকভাবে ভেসে গেছে অনেক মুসলমানই, এমনকি বিনষ্ট হয়েছে ইসলামের প্রতি তাদের নূন্যতম অঙ্গিকার যা মুসলিম পরিচিতির জন্য অপরিহার্য। প্রায় দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে প্রচারের প্রভাবে তার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতি হয়েছে বিগত তিরিশ বছরে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বৃটিশের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পেলেও সে যুগের অনগ্রসর প্রচার মাধ্যমের ফলে সাংস্কৃতিক আধিপত্য এতটা প্রবলতর হয়নি। ফলে জীবন-যাত্রা পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন, রুচীবোধে পাশ্চাত্যের প্রভাব সেদিন এতটা তীব্রতর হয়নি।


ভারতবর্ষে আর্য আগ্রাসন, ফিলিস্তিনে ইহুদী আগ্রাসন এবং আমেরিকায় ইউরোপীয় আগ্রাসনের মধ্যে গুনগত সাদৃশ্য প্রকট। এরা বিজিত দেশের মূল অধিবাসীদের অধিনত বা নির্মূলের মধ্য দিয়ে নিজেদের আবাদি গড়েছে। অথচ প্রচারের বলে এরাই বিশ্বে ভালো মানুষ সেজেছে। অপরদিকে মুসলমানদের চিত্রিত করেছে সন্ত্রাসী, বর্বর ও অন্যান্য নানা বিশ্লেষনে। রক্তের গন্ধ আবিস্কার করছে মুসলমানদের ইতিহাস থেকে। অথচ দু'-দুটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে কয়েক কোটি মানুষ হত্যা করেছে তারাই। আরো কয়েক কোটিকে করেছে পঙ্গু। হিরোশিমা ও নাগাসাকির মত দুটো শহরকে পরিণত করেছে ধ্বংসস্তুপে। অথচ মুসলমানেরা যেখানেই গিয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিদ্যালয় গড়ে সভ্যতার উন্নতিকে ত্বরান্বিত করেছে। মুসলমানদের ভান্ডার থেকে এমনকি ইউরোপীয়রাও ফসল কম তোলেন। ইউরোপের শিল্প বিপ্লব এসেছিল বস্তুতঃ স্পেনের মুসলমানদের থেকে বিদ্যা লাভের পরেই।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ১১ই সেপ্টেম্বর এসেছে মাত্র একবার। অথচ সেটি ফিলিস্তিনিদের জীবনে এসেছে বহুবার। এবং সেটি ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে যত মানুষ মারা পরেছে তার চেয়ে বেশী মানুষ মারা গেছে সাবরা ও শতীলার ফিলিস্তিনি উদ্ধাস্ত শিবিরে। গত ৬০ বছরের বেশী সময় ধরে যে ফিলিস্তিন সন্ত্রাসের শিকার অথচ তাদেরকে আজ বলা হচ্ছে সন্ত্রাসী। এবং সেটি প্রচারজগতে আধিপত্য থাকার কারণে। দেশ শাসনে এক কালে রাজকীয়, সামরিক ও সামন্ত অভিজাতদের আধিপত্য ছিল। প্রচার প্রযুক্তির উৎকর্ষে এসব অভিজাতেরা এখন অপসারিত অথবা তাদের সে আধিপত্য এখন সংকুচিত। তাদের স্থান দখল করেছে মিডিয়া কর্মী ও কলামিস্টরা। এরাই এখন ইস্যু তৈরী করে এবং সে ইস্যুর পিছনে জনমতও গড়ে। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, এসব ইস্যুর পক্ষে কাজ করা ছাড়া রাজনীতিবিদদের আর কোন উপায়ও থাকে না। এভাবে রাজনীতিকরা মিডিয়ার কাছে জিম্মি বৈ নয়। ভৌগলিক সীমানা দিয়ে সীমাবদ্ধ না হওয়ায় মিডিয়ার প্রতাপ এখন বিশ্বব্যাপী। তাদের দ্বারাই বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতিও। বিশেষ করে আজকের মেরুদন্ডহীন মুসলিম বিশ্বের। নিউইয়র্কস্থ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত প্রফেসর এডওয়ার্ড সাঈদ Covering Islam নামে একখানি বই লিখেছেন। এডওয়ার্ড সাইদ একজন ফিলিস্তিনী আরব, যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী মহলে তার পরিচিতিও প্রচুর। ক্যাম্পডেভিট চুক্তির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরবদের সম্পর্কে বড় আকারের ফাটল ধরে। সে ফাটলেরই মেরামতে প্রফেসর সাঈদকে বিশেষ দায়িতু দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট কার্টার। সেহেতু বলা যায়, মার্কিনীদের অনেক নাড়ীর খবরই তার জানা। তার বইতে তিনি প্রমাণ করেছেন মার্কিন প্রচার মাধ্যম কতটা জঘন্য রুপে পক্ষপাতদুষ্ট এবং মুসলিম স্বার্থবিরোধী। তার মতে যুক্তরাষ্ট্রে ইদানিং ঝাঁকে ঝাঁকে আবির্ভূত হচ্ছে অসংখ্য মুসলিম বিদ্বেষী বুদ্ধিজীবী, এদের কাজই হল মুসলিম বিশ্বে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপট তৈরী করা। অথবা কোন আগ্রাসন পরিচালিত হলে সেটিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জায়েজ প্রমাণিত করা। অনেকেরই আফসোস, পাশ্চাত্য বিশ্ব কেন এখনও মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে না। তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হল, পঞ্চদেশ ও ষোড়শ শতাব্দির পুর্তগীজ আগ্রাসনই বর্তমান পশ্চিমা শাসকবর্গের জন্য মডেল হওয়া উচিত। তাদের মতে ঔপনিবেশিক শাসনই বিশ্বে শেষবারের মত শান্তি (?) এনেছিল (J.B.Kelly, Arabia, The Gulf and the West: A Critical View of the Arabs and Their Oil Policy, London: Weidenfeld and Nicolson, 1980)। যদিও সে শান্তি ছিল হত্যা ও লুন্ঠনের মাধ্যমে নিরীহ ও নিঃসম্বল মানুষের সামরিক ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বের। এশিয়া আফ্রিকার মজলুম মানুষের স্বাধীনতাকে এরা বর্বরতা বৈ ভিন্নরুপে দেখে না।

 

পাশ্চাত্যের শাসকবর্গ কোন ধর্মকেই নিজেদের জন্য আজ আর হুমকি ভাবে না। তবে ইসলামই এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইসলামের উত্থান তাদের কাছে এক নিদারুন ত্রাস। যারাই এ উত্থানের পক্ষে তারাই তাদের কাছে সন্ত্রাসী। ইসলামের অনুসারীদের পরিকল্পিতভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে মানবতার দুশমনরুপে। এ প্রচারণায় মূল ভূমিকা নিচ্ছে পাশ্চাত্যের মিডিয়া। অথচ মুসলিম বিশ্বে যারা সত্যিকার জালেম, যাদের দেশে প্রতিবাদী আওয়াজ তোলার নূন্যতম শাস্তি হল প্রাণদন্ড তাদের সাথে ওদের সখ্যতা অতি নিবিড়। বিস্তর অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিয়ে এসব দেশের স্বৈরাচারী শাসকদেরকে টিকিয়ে রাখাই হল এদের বিদেশনীতি। এ কাজকে এরা বলে স্থিতিশীলতা। এমন স্থিতিশীলতার স্বার্থে যে কোন সামরিক বর্বরতার পরিচালনায় বা সমর্থনদানে এদের আপত্তি নেই। আলজেরিয়াতে এমনই এক বর্বরতা চলছে সেদেশের স্বৈরাচারী শাসককের হাতে। অথচ পশ্চিমা মিডিয়া এ বর্বরতা দেখেও দেখে না, শুনেও শুনে না। নিশ্চুপ এরা কাশ্মির ও ফিলিস্তিনে পরিচালিত নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধেও। বরং বর্বরতা খুঁজে ইরানে বা সুদানে। কারণ সেখানে ক্ষমতাসীন হল ইসলামপন্থীরা। নিশ্চুপ এসব দেশের একাডেমী বা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহও। পাশ্চাত্যের নীতি ও নৈতিকতায় কতটা মড়ক লেগেছে সেটি এ থেকেই অনুমেয়। বিবেকের যে অসুস্থ্যতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিরোশীমা ও নাগাসাকির কয়েক লক্ষ নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও বেসামরিক মানুষকে জীবন্ত দগ্ধ করে বিজয়ের আনন্দ খুজেছিল সে অসুস্থ্যতা থেকে আজও তাদের আরোগ্য মেলেনি এসব তাদেরই আলামত। ইরাকে ও আফগানিস্তানে হাজার হাজার টন বোমাবর্ষন, ইরাকের শিশু হাসপাতালে বোমাবর্ষন, মিজাইল ছুড়ে ইরানের বেসামরিক বিমানের যাত্রী হত্যা - এ সব নিষ্ঠুরতা সে নৈতিক অসুস্থ্যতারই প্রমাণ। মিডিয়ার অপরাধ তারা সে নিষ্ঠুরতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে না। তারা সুনামীতে ধ্বংস হওয়ার আগে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ দ্বীপের তুলনামুলক ছবি দেখায়। কিন্তু এ ছবি দেখায় না মার্কিনীদের বোমাবর্ষনের পূর্বে ইরাকের ফালুজা কেমন ছিল।


প্রচার মাধ্যমে ইহুদীদের আধিপত্য অতি প্রবল। রয়টারের মত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তাদেরই। টাইম, নিউজ উইকের মত বহুল প্রচারিত পত্রিকাগুলোর প্রভাবশালী সাংবাদিক ও কলামিস্ট তারাই। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ইহুদী শিক্ষকগণই অধিকতর প্রভাবশালী। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে প্রচার মাধ্যম এসব শিক্ষকদের মতামতকেই অধিকতর গুরুত্ব দেয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশাসনও নির্দেশনা নেয় তাদের থেকেই। প্রচারে ইহুদীদের প্রভাবের কারণেই ফিলিস্তিনী বসতি নিমূর্লের পরও আগ্রাসী ইহুদীরা প্রচার পায় শান্তিবাদী রুপে। অথচ ইসরাইলের জন্মই হয়েছে সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে। টিকেও আছে বিরামহীন সন্ত্রাস চালিয়ে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুদ্ধ আর সন্ত্রাস চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে তারাই বিনষ্ট করেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, মার্কিনীদের পর তারাই এখন বিশ্বের বৃহৎ আগ্রাসী শক্তি। আর এদের সাফাই গাচ্ছে পাশ্চাত্যের মিডিয়া। মিডিয়ার হাতে জিম্মি পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতিকেরাও, ইসরাইলী স্বার্থের বিরোধীতা দূরে থাক তাদের স্বার্থে সামান্য নিরবতাও তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনে। মিডিয়ার আগ্রাসনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাদের বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞতাকে তারা একটি ন্যয্য-যুদ্ধ রূপে বিশ্বময় প্রচার করছে। পাশ্চাত্য বিশ্বে সেটি গ্রহণযোগ্যতাও পাচ্ছে। মিডিয়া যে কিভাবে মানুষের মনের ভূবনে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এ হল তার নজির। এককালে বহু অর্থ ও বিপুল রক্তক্ষয়ে প্রকান্ড এক সামরিক যুদ্ধ লড়েও এমনটি সম্ভব ছিল না। আগ্রাসী শক্তি রূপে এটিই হল মিডিয়ার ক্ষমতা। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব আজ সে শক্তির কাছেই প্রচন্ড ভাবে পরাজিত।

Comments (2)
2 Sunday, 30 August 2009 08:34
Dr Mohammad Abul Bashar

Thank you for your thoughtful analytical writing. I am impressed. I want to add with you, time has ripen enough to discuss these issues. From eminent Jamaluddin Afghani to recent days scholar highlighted many aspects of Muslim education to revert it into Islamic education. I shall rather want to give emphasis on leadership and research that can modulate the present history to our desired design. We criticise a lot but we dont put real example. We have a lot of theoretician all over the world. But most of our scholars are preoccupied.

Read more...
1 Thursday, 26 February 2009 00:06
Tuhin

Salam.

Excellent, Firoz bhai ! I finished your article in one breath.
I found people are so afraid having a honest debate about 71-in particular the way freedom was given to us. I put a suggestion to one senior person of IM that IM must not shy away from raising this debate in local and national level. It is a blessing from Allah (SW) that AL pushing 71 agenda again. IM should grab the opportunity and show our nation with recent developments that the concerns, IM had about 71 are being materialised with growing Indian Dominance in the subcontinent. Genocide or war crime is separate issue, every responsible person whichever side may be, is to be tried under a rule of law compatible and recognised by similar international law.

Read more...


Bookmark this,
 
Banner