|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
|
আমার এই স্মৃতিকথা সাহিত্য সংস্কৃতি জনকল্যাণ সংস্থা সেবা’র চেয়ারম্যান আশরাফ হোসেইনের অনুরোধে, তাগিদে এবং অনূপ্রেরণায় লিখতে শুরু করি। আসলে লিখতে নয় আমি মুখে মুখে কথাগুলো বলে যেতাম, আশরাফ হোসেইন ওগুলো লিখে নিতো এবং এ রচনা তারই বিভিন্ন সংকলনে এবং পরে মাসিক নতুন সফরে ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছে। কেনো এ স্মৃতিচারণা করতে রাজী হয়েছি সে কথা একটু বলা দরকার। ৭১ এর পর আমরা যারা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমর্থন করিনি তারা কলাবোরেটর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলাম। আমি ৭১ এর ডিসেম্বর থেকে ৭৩ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলে ছিলাম এবং তখন থেকে পাকিস্তান আন্দোলন ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাস সম্বন্ধে এমনসব কথা শুনেছি যা শুধু উদ্ভটই নয়, সম্পূর্ণ কাল্পনিক। আমাদের কথা বলার সুযোগই ছিল না। আমরা যে, একটা আদর্শে বিশ্বাস করতাম সে স্বীকৃতি পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে উত্থিত অভিযোগের মধ্যে ছিল না।
৪০ সাল থেকে ৪৭ সাল পর্যন্ত যে অসংখ্য তরুণ পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিল, আমি তাদের অন্যতম। কৃতিত্বের জন্য একথা বলছি না, নিজের পরিচয় দেবার জন্য কথাটি উল্লেখ করছি। ৪১-৪২ সালে আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ছাত্র, তখন আমাকে সভাপতি করে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠিত হয়। সৈয়দ আলী আহসান ছিল এ সংসদের সেক্রেটারী। আমাদের লক্ষ্য ছিল, বাংলা ভাষায় মুসলিম কালচারের পরিচয় থাকে এমন সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকদের উদ্বুদ্ধ করা। ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইষ্ট পাকিস্তান রেনেসাঁস সোসাইটি (এর সভাপতি ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন) যে সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে তাতে ২৪ বৎসর বয়সে সাহিত্য শাখার সভাপতির দুর্লভ সম্মান লাভ করেছিলাম। এরপর সে বছর জুলাই মাসে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে লেকচারার হিসাবে যোগ দেই।
|
|
Read more...
|
|
|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
|
সংকটের সূচনা
৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যখন রাজনৈতিক দূর্যোগ ঘনিয়ে আসে তখন আমি রাজশাহীতে। ভাইস চান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত। ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরই দেশের আবহাওয়ায় একটা গুরুতর পরিবর্তন ঘটে। নির্বাচনের পূর্বেই আওয়ামী লীগ নেতারা ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের ছয় দফা দাবী আলোচনা সাপেক্ষ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ব্যপারে স্থির নিশ্চয় হলেও এর খুটিনাটি সম্বন্ধে আলোচনা করতে রাজী থাকবেন। অথচ যখন দেখা গেল দু'টো আসন ছাড়া আওয়ামী লীগ সবগুলো আসনই দখল করতে সমর্থ হয়েছে তখন তারা বললেন যে, ছ'দফার কোন নড়চড় হবে না। এই অনমনীয় মনোভাব সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ বহির্ভূত অনেকের ধারণা ছিল যে শেষ পর্যন্ত একটা আপোষ করা সম্ভব হবে। কারণ ছ'দফায় স্বায়ত্তশাসনের কথা ছিল, স্বাধীনতার দাবী ছিল না। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ের পরক্ষণেই ঘোষণা করা হল যে আওয়ামী লীগ নেতা রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে যাবেন না এবং গণপরিষদের বৈঠক পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হতে হবে। সংসদে নবনির্বাচিত সদস্যরা ঢাকায় বসে হলপ গ্রহণ করলেন যে তারা ছ'দফা থেকে কিছুতেই বিচ্যুত হবেন না।
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
|
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
|
ষড়যন্ত্রের পটভূমি
পাকিস্তান ধ্বংস হতে চলেছে এটা যেনো চোখে দেখেও আমার বিশ্বাস হতে চাইতো না। ১৯৪৭ সালের কথা। আমার মনে আছে যে উৎসাহ ও আশা নিয়ে লাখ লাখ নর-নারী এই নতুন রাষ্ট্রের আবির্ভাবকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলো সেটা আমার বয়সের লোকের ভুলবার নয়। ৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট আমি কোলকাতায় ছিলাম। এ কারণে ব্যক্তিগতভাবে ঢাকায় যে উন্মাদনাময় পরিবেশের মধ্যে পাকিস্তান জন্ম লাভ করে তাতে আমি অংশ গ্রহণ করতে পারিনি। কিন্তু মিছিল, শোভাযাত্রা ইত্যাদির বিবরণ পড়ে কল্পনার নেত্রে সে দৃশ্য অবলোকন করতে অসুবিধা হয়নি। তার একটা বড় কারণ, আমি নিজেও এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমরা বিশ্বাস করতাম যে ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক সমস্যার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমাধান এই উপমহাদেশকে বিভক্ত করে হিন্দু ও মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করা। ভাষা বা ভৌগলিক বৈচিত্রের কোন গুরুত্ব নেই, এ কথা কখনো আমরা বলিনি। কিন্তু ভাষা এবং আঞ্চলিক কালচারের ভিত্তি মেনে নিলে ভারতবর্ষকে অন্ততঃ বিশটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রয়োজন হবে, কারণ 'ভারতীয়তা' বলে কোন বস্তুর অস্তিত্ব ছিল বলে আমরা বিশ্বাস করতাম না। যদি বলা হয় যে পাঞ্জাবী মুসলিম বা পাঠান মুসলিমের সঙ্গে বাঙ্গালী মুসলিমের তফাত অনেক, এ কথা তো হিন্দু সম্প্রদায় সম্পর্কে আরো সত্য। মুসলমানের ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আচার পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে না। কিন্তু ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু ধর্মের রূপ বিভিন্ন। যে সমস্ত দেবতা দক্ষিণ ভারতে বা পশ্চিম ভারতে অর্চিত হন, বাংলা বা আসামে তাদের কেউ পূজা করে না। রাম উত্তর ভারতে দেবতা বলে স্বীকৃত, বাংলায় তিনি রামায়ণের নায়ক মাত্র। এ রকমের আরো ভিন্নতার কথা উল্লেখ করা যায়। সে জন্য জওহরলাল নেহেরুর মতো যাঁরা সেকুলার ভারতীয়তার কথা বলতেন তাঁরা প্রকারান্তরে বুঝাতে চাইতেন যে ভারতীয় কালচারের অর্থ হিন্দু ধর্মভিত্তিক কালচার। ১৯৬২ সালে - '৪৭ সালের ১৫ বছর পর নেহেরুরর এক বক্তৃতায় যে কথা স্বকর্ণে শুনেছিলাম তাতে আমার ঐ উক্তির সমর্থনই ছিল। দিল্লীর এক সভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন যে, ভারতীয় সংস্কৃতির সৌধ সম্পূর্ণভাবে সংস্কৃত ভাষার উপর প্রতিষ্ঠিত। অবশ্য এ কথাই ৪০-এর দশকে প্রকাশিত তাঁর 'ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া' বইটিতে তিনি আরো সবিস্তারে বিবৃত করেছেন। ভারতবর্ষের যে রূপ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বলে দাবী করেন তার মধ্যে সাতশ' বছর ধরে ভারতের বুকেই মুসলমানেরা যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলো তার কোন সন্ধান ছিলো না। এই সত্যের উপরই পাকিস্তান আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। তাই তখন যে যাই বলুক ধর্ম বিশ্বাসকে আমরা এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান পরিচয় রূপে স্বীকার করে নিয়েছিলাম এবং এই কারণেই উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের অনেক মুসলমান যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলো তেমনি বিহার-উড়িষ্যা এবং আসাম থেকে বহু মুসলমান বিতাড়িত হয়ে পাকিস্তানে নীড় বাঁধবার চেষ্টা করে। ৭০-৭১ সালে আমরা শুনলাম যে এই নবাগতরা সবই বিদেশী, তাদের না তাড়ালে এ অঞ্চলের আদিবাসীদের পরিত্রাণ নেই।
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
|
আর্মির অবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি
১৩ই এপ্রিলের পরের যে সমস্ত ঘটনার কথা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে তার মধ্যে একটি হলো ২১ শে এপ্রিল ইকবালের মৃত্যূ দিবস পালন। হল বন্ধ। ক্যাম্পাসে ছাত্র ছিলো না। সুতরাং কয়েকজন শিক্ষককে অনুষ্ঠান করতে হলো। সভা বসলো ভাইস চান্সেলরের হল কামরায়। কয়েকজন মিলিটারী অফিসারও যোগ দিয়েছিলেন। প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ডঃ মতিয়ুর রহমান। আমাকেই সভাপতিত্ব করতে হলো। বক্তারা সবাই বললেন যে, বতর্মান অবস্থাতেও ইকবালের আদর্শ ম্লান হবার নয়। কারণ স্বাপ্নিক কবি এবং দার্শনিক হিসাবে তিনি যে বাণী রেখে গেছেন তার তাৎপর্য কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়। আমরা জানতাম হয়তো ঢাকায় বা দেশের অন্যত্র ইকবাল দিবস পালন করা হবে না। কিছুদিন আগেই সম্ভবতঃ ফেব্রুয়ারীতে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে গোলযোগের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ইকবাল হলের নাম বদলিয়ে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল করেছিল। এ কাজের সমর্থন আমি কখনই করতে পারিনি। এ রকম উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে যদি রাস্তাঘাট বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম বদলাবার পালা শুরু হয় তবে তো প্রতি তিন চার বছর পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সব পাল্টিয়ে ফেলতে হবে। লন্ডনে-প্যারিসে বহু প্রাচীন নাম বহু শতাব্দী থেকে প্রচলিত রয়েছে। ফ্রান্সে যে রাজাদের বিরুদ্ধে ১৭৮৯ সালে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তাদের নামও বহু রাস্তাঘাট, প্রতিষ্ঠান বহন করছে। আমাদের দেশের নাম পরিবর্তনের মধ্যে ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করার যে প্রবণতা লক্ষিত হয় সেটা যেমন দুঃখজনক তেমনি হাস্যকর। একটা নাম বদলিয়ে ফেললেই ইতিহাস বদলে যায় না। করাচীতে গান্ধী গার্ডেনস-এর নাম বদলাবার কথা তো কেউ কখনো ভাবেনি। আমাদের মধ্যে সাময়িক উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে অতীতকে অস্বীকার করার এই যে দৃষ্টান্ত তার নজির অন্যত্র বিরল। আর্মি ক্যাম্পাসে এসে অনেক শিক্ষক এবং অফিসারের ব্যাংক একাউন্ট ফ্রীজ করে দিয়েছিলো। এঁদের নিয়ে সমস্যায় পড়লাম। ইউনিভার্সিটি ব্যাংক চালু হওয়া সত্ত্বেও এঁরা কেউ টাকা তুলতে পারছিলেন না। ডক্টর মতিয়ুর রহমানের মারফত আর্মিকে জানানো হলো যে এ ব্যবস্থা চলতে পারে না। এঁরা টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে যাবেন তার কোনো সম্ভাবনা নেই। যারা ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ায় চলে গিয়েছিলেন তাদের কথা আলাদা কিন্তু যারা এই দূর্যোগের মধ্যেও দেশ ত্যাগ করেননি, ক্যাম্পাস ছেড়ে যাননি, তাদের অসুবিধা সৃষ্টি করা হবে কেনো? আর্মি শেষ পর্যন্ত সব একাউন্টই রিলিজ করে দেয়। শিক্ষক এবং অফিসার যাঁরা গ্রামে পালিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা কেউ কেউ ফিরে আসতে শুরু করলেন। কিন্তু অনেকেই ফিরে আসতে ভয় পাচ্ছিলেন। আমি যখন মে মাসে ঢাকা যাই তখন কয়েকজন শিক্ষক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আর কোনো ভয় নেই এই আশ্বাস দিলে তারা প্রত্যাবতর্ন করতে শুরু করেন । কিন্তু সেটা পরের কথা।
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
|
শরণার্থী
মে মাসের শেষের দিকে ইন্ডিয়ায় শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু আশ্চর্য কয়েকদিনের মধ্যেই এই সংখ্যাকে ষ্ফীত করে হাজার থেকে লাখ, লাখ থেকে কোটিতে নিয়ে আসা হয়। একদিন বা দু'দিনের ব্যবধানে সংখ্যার এমন তারতম্য কিভাবে ঘটতে পারে তা আমাদের বোঝা সাধ্যাতীত ছিলো। এই প্রপাগান্ডায় বিশ্বাস করতে হলে বিশ্বাস করতে হতো যে পূর্ব পাকিস্তানের রাস্তাঘাটে নদীপথ সর্বত্র শরণার্থীর ভীড়ে একটা জমাট বেঁধে গিয়েছিলো। এমন কিছু অন্তত আমার চোখে পড়েনি। তবে কয়েক লক্ষ লোক যে আর্মির ভয়ে ইন্ডিয়ায় পালিয়ে যায় তা অস্বীকার করার প্রশ্ন ওঠে না।
বহু বিদেশী সাংবাদিক এই উদ্বাস্তুদের দেখতে ছুটে আসেন এবং এদের দুর্দশার কথা ফলাও করে প্রচার করেন। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা যে পাকিস্তানের ঘরোয়া সমস্যা নয়, সে কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। শরণাথীঁদের সাহায্যের জন্য ইন্ডিয়াকে প্রচুর সাহায্য দেয়া হয়। সেই সাহায্য কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে সে সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনতাম। তবে সেগুলি কতটা সত্য বা মিথ্যা সে কথা আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারবো না। তবে যে কথাটি উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হলো যে, একবার ইন্ডিয়ায় পা দিলে সহজে কারো পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসা সম্ভব ছিলো না। ইন্ডিয়ানরা নাকি তাতে রীতিমতো বাধা দিতো। ইয়াহিয়া খান কয়েক বার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। তার আর একটা কারণ ছিলো এই যে ফেরৎ আসা শরণার্থীরা মাঝে মাঝে আর্মি এ্যাকশনের শিকার হতো। পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থীদের জন্য ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। দু'একটি দুর্ঘটনার পর এ সমস্ত ক্যাম্পে সহজে কেউ আসতে সাহস পেতো না। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ ক্ষমার নীতি যুক্তিযুক্তভাবেই গ্রহণ করেছিলেন, অন্যদিকে স্থানীয় আর্মির চরম হঠকারিতার জন্য সে নীতি বানচাল হয়ে যায়।
সরকারী নির্দেশ মতো ইউনিভার্সিটি খোলা হলো। ছাত্র-ছাত্রী কেউ কেউ ফিরে এলো। ক্লাসও শুরু হলো। তবে এদের সংখ্যা ছিলো খুবই অল্প। অনেক ছাত্র-ছাত্রী আওয়ামী বাহিনীর ভয়েও ক্লাসে আসতে ভয় পেতো। যেমন অনেক সরকারী কর্মচারী কাজে যোগ দিতে ইতস্ততঃ করতো। কোলকাতা থেকে ঘোষণা করা হয়েছিলো যে স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত সবকিছু বর্জন করে প্রশাসনকে প্যারালাইজ করে ফেলতে হবে। তবে এটা মোটেই সম্ভব হয়নি। কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়েছে সত্য কিন্তু প্রশাসনের কাজ রীতিমভোভাবে চলতে থাকে। তার একটা বড় প্রমাণ এই যে, বিদ্রোহী বাহিনী বহু চেষ্টা করেও কোন অঞ্চলে খাদ্য ঘাটতি ঘটাতে পারেনি। দেশের বাইরে থেকে খাদ্য আমদানী যেমন চালু ছিলো তেমনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাল-ডাল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য পাঠানো হতো। চরম দুর্যোগের মধ্যেও কোন এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় নাই। হাট বাজারে মাঝে মাঝে বিদ্রোহী বাহিনীর লোকেরা এসে বোমা ফাটিয়ে অথবা গোলাগুলী করে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে, কিন্তু সেটা সাময়িকভাবে।
|
|
Read more...
|
|
একাত্তরের স্মৃতি
|
|
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন
|
আমেরিকার অভিজ্ঞতা
আমেরিকায় যে তিনটি এপয়েন্টমেন্টে যোগ দিতে পেরেছিলাম, তার একটি হচ্ছে কংগ্রেসের এক সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎকার। দ্বিতীয়টি একজন প্রভাবশালী অধ্যাপকের সঙ্গে আলোচনা এবং তৃতীয়টি পাকিস্তানের প্রেস কাউন্সিলার-এর দেয়া এক লাঞ্চ। এই লাঞ্চে বেশ কিছু মার্কিন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। কংগ্রেসম্যান (তাঁর নামটা এখন মনে পড়ছে না) পাকিস্তান সংকটে প্রচুর সহানুভূতি প্রকাশ করলেন এবং বললেন যে, তাঁর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে পাকিস্তানের শত্রুরা এর পেছনে সক্রিয়। তিনি আরো বললেন যে পাকিস্তানের বক্তব্য যাতে আমেরিকান জনসাধারণের কাছে পৌছে দেয়া যায় তার চেষ্টা তিনি করবেন। তবে একথা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি যে সোজাসুজি পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগ্রহ কোনো আমেরিকান রাজনীতিকের ছিলো না। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মিঃ নিক্সন। পরবর্তীকালে যে সমস্ত দলিল বিশেষ করে তাঁর সেক্রেটারী অব ষ্টেট হেনরি কিসিঞ্জারের বই -'দি হোয়াইট হাউজ ইয়ারস'-এ যে সমস্ত কথা প্রকাশিত হয়েছে তাতে মনে হয় যে যদিও প্রেসিডেন্ট নিক্সন নিজে অনেকটা পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাঁর অধিকাংশ উপদেষ্টা ছিলেন ভারত সমর্থক। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইউরোপ ও আমেরিকা সফর করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাথেও তিনি দেখা করেন। সেই সাক্ষাৎকারের যে বিবরণ বেরিয়েছে তাতেও প্রমাণিত হয় যে প্রেসিডেন্ট নিক্সন মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তার কারণ ছিলো এই যে তিনি বিশ্বাস করতেন যে অচিরেই পাকিস্তান ভেঙ্গে পড়বে। সুতরাং হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন কি? নিক্সন যদি জোরালো ভাষায় মিসেস গান্ধীকে বাধা দিতেন, বলা নিষ্প্রয়োজন যে, ভারত পাকিস্তানের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করার সাহস পেত না এই ঘটনায় আরো প্রমাণিত হয় যে ভারতের প্রচারণার ফলে পাকিস্তান কতটা নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে পড়েছিলো। বড় শক্তিগুলির মধ্যে একমাত্র চীন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করে। কিন্তু চীনের পক্ষে সরাসরি সৈন্য পাঠিয়ে ভারতের মোকাবেলা করা সম্ভব ছিলো না। এই খবর চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই পাকিস্তানকে গোপনে জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের এক কূটনীতিক অতি কৌশলে সংবাদটি ভারতকেও জানিয়ে দেন। এবার ভারতের পক্ষে আর বাধা রইলো না। যদিও নির্বোধ ইয়াহিয়া খান শেষতক এই বিশ্বাস নিয়ে বসেছিলেন যে ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তানের উপর হামলা করে আমেরিকা ও চীন পাকিস্তানের পক্ষ গ্রহণ করবে।
যাক, এসব অনেক পরের কথা। আমি জুলাই মাসে ফিরে যাচ্ছি। নিউইয়র্ক থেকে আমরা দু'দিনের জন্য ওয়াশিংটন চলে আসি। এখানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদুত ছিলেন আগা হেলালী, আগা শাহীর বড় ভাই। তিনি অনেক দিন পূর্ব পাকিস্তানে চাকূরী করেছেন। এ দেশের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে পরিচিত ছিলেন। সংকটের কোন সমাধানের কথা তিনি বলতে পারলেন না। শুধু আশা প্রকাশ করলেন যে পূর্ব পাকিস্তানবাসী মুসলমান বুঝতে পারবে যে এই আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধের দ্বারা তারা নিজেদের সর্বনাশ করবে।
|
|
Read more...
|
|
|
|
|
|
|
Page 1 of 3 |