|
মার্কিন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বারাক হোসেন ওবামা। তাঁর বিজয়ে আনন্দ-উৎসব হয়েছে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বহুদেশে। কোন এক ব্যক্তির নির্বাচনী বিজয়ে দেশ, বর্ণ, ভাষা ও ধর্মের গন্ডি ডিঙ্গিয়ে এভাবে আনন্দ প্রকাশের ঘটনা বিরল। নির্বাচন-পুর্বে মিশরে এক জরিপ চালিয়েছিল “দি ইকোনমিষ্ট”। সে জরিপে প্রকাশ পায়, ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলে শতকরা ৯১ ভাগ মিশরীয়ই ভোট দিত বারাক ওবামাকে। ব্রাজিলের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী নাম পরিবর্তন করে ভোট চেয়েছে ওবামা নামে। অনেকের ধারণা, ওবামার বিজয়ে মার্কিন রাজনীতিতে শুরু হবে নতুন যুগ। তাদের কথা, ওবামা হলেন একাবিংশ শতাব্দীর নেতা। তাদের যুক্তি, তাঁর পিতা আফ্রিকার মুসলিম পরিবারের। মা একজন শ্বেতাঙ্গ মার্কিন। তাঁর শৈশব কেটেছে ইন্দোনেশিয়ায়। লেখাপড়া করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কর্মজীবনের শুরুতে সমাজকর্মী রূপে কাজ করেছেন দরিদ্র শ্রমিক এলাকায়। এভাবে তার চরিত্রে সংমিশ্রণ ঘটেছে বিচিত্র ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর পদে বসবার জন্য এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ নিশ্চয়ই দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ -যা অতীতে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই ছিল না। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ৮ বছরের শাসনামলে বিশ্বজুড়ে সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য জঘন্য অপরাধ। দীর্ঘকাল ব্যাপী যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে ইরাক ও আফগানিস্তানে। দেশদুটিতে নিহত বা আজীবনে জন্য পঙ্গু হয়েছে বহুলক্ষ নিরপরাধ মানুষ। ধ্বংস হয়েছে বহু হাজার ঘরবাড়ি ও দোকান-পাঠ। অসংখ্য মানুষ কারারুদ্ধ ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে বাগরাম, আবুগারিব ও গুয়ান্তানামোর ন্যায় কারাগারে। বিশ্বের বহু শহর ও জনপদ থেকে অসংখ্য মানুষকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। বুশের যুদ্ধাংদেহী নীতির কারণেই আযাব নেমে এসেছে বিশ্ব-অর্থনীতিতে। বন্ধ হয়েছে বহু কলকারখানা ও ব্যাংক। চাকুরি হারিয়েছে শুধু দরিদ্র দেশের কর্মজীবী লক্ষ লক্ষ মানুষই শুধু নয়, বহু লক্ষ মার্কিনীও। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় গৃহহীন হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বিগত সত্তর বছরের ইতিহাসে এরূপ অর্থনৈতিক বিপর্যয় দ্বিতীয়টি আসেনি। ৮ বছর আগে একজন মার্কিনীর পক্ষে গরীব হওয়াই অস্বাভাবিক ছিল, আর এখন স্বচ্ছল থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বহু হাজার বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে নিছক মানুষ হত্যায় ও দেশ-ধ্বংসে। অথচ এ অর্থে বিপুল কল্যাণ হতে পারতো বিশ্বজুড়ে। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন মার্কিন রাজস্ব-ভান্ডারে আড়াই শত বিলিয়ন ডলারের বেশী উদ্ধবৃত্ত ছিল, অথচ এখন দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দায়গ্রস্ত দেশ। যুদ্ধ এখন আর শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমাবদ্ধ নয়, গ্রাস করছে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও। বিশ্ব-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখা এখন মার্কিনীদের সামর্থের বাইরে। প্রচন্ড বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিশ্ব-শক্তি রূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টিকে থাকাটাও। বুশের ভ্রান্ত-নীতিই মূলতঃ সম্ভব করেছে ওবামার বিজয়। তার কারণে সমগ্র বিশ্বটাই মার্কিনীদের জন্য বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিপ্রান্তে মার্কিন নাগরিকগণ পরিণত হয়েছে ঘৃণার পাত্রে। এমন ঘৃণার কারণে মার্কিন পরিচয় নিয়ে অন্যদেশের রাজপথে চলাফেরা করাটিও এখন বিপদজনক। তাই ওবামা না হলে আরেকজন ওবামাকে সন্ধান করা তাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। এমন এক পরিস্থিতে ওবামা আবির্ভূত হয়েছেন মুক্তির অবতার রূপে। আগামী ২০ই জানুয়ারীতে ওবামার দখলে যাচ্ছে হোয়াইট হাউস। তখন তিনিই হবেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি। তাঁর উপর দায়ভার বিশাল। মার্কিন নীতি বলতে বিশ্ববাসী বুঝে, বিরামহীন যুদ্ধ। বুঝে, নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যা ও পঙ্গুত্বসাধন। বুঝে, আবু গারিব, গোয়ান্তোনামো বে’ ও বাগরামের কারাগার। বুঝে, বিয়ের আসর, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বসতগৃহের উপর বোমা বর্ষন। বুঝে, স্বৈরাচারি জালেম শাসকদের প্রতি নিঃশর্ত্ব সমর্থণ। বুঝে, ইসরাইলের বর্বর আগ্রাসান, বোমা-বর্ষন, ফিলিস্তিনি-ভূমির জবরদখল। প্রশ্ন হল, ওবামা কি এমন মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন? নির্বাচনী প্রচারণায় শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, তিনি বিশ্বকে পাল্টে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। সে ওয়াদা তিনি কতটা পূরণ করতে পারবেন? এ নিয়ে বিশ্ববাসী যে হতাশ হবে সে আশংকাই কি কম? কারণ, যে দুর্বৃত্তি ও সন্ত্রাসের রাজত্বকে মার্কিন সরকার যুগ যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা দিয়েছে সেটির নির্মূলে যে নৈতিক বল ও সাহস চাই সেটি কি ওবামার আছে? নির্বাচনী প্রচারে ফেরেশতা সাজা কারো জন্যই কঠিন নয়। কঠিন নয় এমনকি অতিশয় সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তের জন্যও। কঠিন ছিল না হিটলারের জন্যও। কিন্তু বাস্তবে কিছু করতে হলে তো প্রবল শক্তি চাই নীতি ও নৈতিকতায়। সমস্যা বাধে তো সেখানেই, কারণ সবার সেটি থাকে না। সে নৈতিক বলে ওবামার ঘাটতি কি কম? তারই কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। ওবামা ইরাক যুদ্ধের বিরোধীতা করলেও আফগানিস্তানের উপর হামলার বিরোধীতা করেননি। বরং সে হামলার তিনি ঘোরতর সমর্থক। এর অর্থ দাঁড়ালো, ওবামা আদৌ যুদ্ধাবিরোধী নন। এবং বিরোধী নন বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য বিস্তারেও। শুধু ইরাক যুদ্ধটিই নয়, আফগানিস্তানের উপর যুদ্ধটিও হয়েছিল অতি অন্যায় ভাবে। তালেবানগণ কোন দেশের বিরুদ্ধে একটি গুলিও ছুড়েনি। কোথাও কোন মারাণাস্ত্র বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি। ১১ই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে যারা হামলা করেছিল তাদের কেউই আফগান ছিল না। আফগানিস্তান যদি কাউকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে থাকে তবে সে অপরাধে বিচার হতে পারতো আন্তর্জাতিক আদালতে। অন্যদেশের রাজনৈতিক শত্রুদের আশ্রয়দানের কাজ তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য জগতের বহুদেশই করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিয়েছিল ইরানের বিতাড়িত বাদশাহ মহাম্মাদ রেজা শাহকে। রেজাশাহ ইরানের বিপুল সম্পদ নিয়ে সেখানে পালিয়েছিল, ষড়যন্ত্র করছিল আবার ক্ষমতা দখলের। তাই এ অপরাধে একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুকে কি বৈধ বলা যায়? অথচ মার্কিনীরা আফগানিস্তানে সেটিই করেছে। আসলে এটি ছিল বাহানা মাত্র। মার্কিনীদের কাছে তালেবানদের মূল অপরাধ, তারা ইসলামের মৌল-শিক্ষায় বিশ্বাস করে, এবং সেটির পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জানমালের কোরবানীতেও রাজী। তারা দুষমন পাশ্চাত্যের সেকুলার দর্শনের। এদিক দিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তারাই ব্যতিক্রমধর্মী। পাশ্চাত্য মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ মার্কিনীদের কাছে অসহ্য। আর এখান থেকেই মূল শত্রুতার শুরু। পুঁজিবাদী বিশ্ব এককালে কম্যুনিজমকে তাদের দর্শন ও মূল্যবোধের শত্রু মনে করত। তারা এখন কম্যুনিজমের স্থানে বসিয়েছে ইসলামকে। এমন অভিন্ন পুঁজিবাদী চেতনা বারাক ওবামারও। তাঁর কথা, তালেবানদের ইসলাম হল রাডিক্যাল ইসলাম – এবং এ ইসলাম থেকেই জন্ম নেয় জ্বিহাদ। সে জ্বিহাদই তার দৃষ্টিতে সন্ত্রাস। তাই ওবামার কাছে আফগানিস্তান হল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল ফ্রন্ট-লাইন। কথা হল, বুশ ও ম্যাককেইনের চেয়েও ওবামা কি এক্ষেত্রে কম যুদ্ধাংদেহী? বরং পার্থক্য হল, বুশ বা ম্যাককেইন কেউই আফগানিস্তানে আরো অধিক মার্কিন সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রচন্ড উৎসাহ ওবামার। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি আফগানিস্তানে আরো মার্কিন সৈন্য পাঠানোর কথা একবার নয়, বহুবার বলেছেন। অথচ মার্কিন বাহিনী সেখানে যে কাজটি করছে সেটি শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়। বিগত সাত বছরের মার্কিন-জবরদখলে শান্তির পরিমাণ সেখানে একটুও বাড়েনি, বরং বেড়েছে রক্তপাত, ধ্বংস, জেল-জুলুম ও নানা রূপ অশান্তি। বেড়েছে আফিম চাষ। মার্কিন সৈন্যরা সেখানে নিরপরাধ নাগরিক হত্যায় লিপ্ত। হত্যাকান্ডের পরিধি ও কলেবর বাড়াতে এখন নিয়মিত হামলা করছে প্রতিবেশী পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও। হামলা করছে এমনকি বিয়ের মজলিসে। ক’দিন আগে দক্ষিণ আফগানিস্তানের এক গ্রামে বিয়ের মজলিসে হেলিকপ্টার থেকে মিজাইল ছুঁড়ে ৫০ জনেরও বেশী নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করেছে। এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। গত ৭ই নভেম্বর পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের এক গ্রামে এরূপ হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে ৮ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। কিছুদিন আগে এমন আরেক হামলায় হত্যা করেছিল ২০জনকে। যে কোন সভ্য দেশে পথে-ঘাটে পাখি-শিকারেরও প্রতিবাদ হয়; বিচারও হয়। কিন্তু এরূপ নৃশংস মানব-হত্যার বিরুদ্ধে কোন বিচার নেই; প্রতিবাদও নেই। এ অবধি কোন মার্কিন সৈন্যের সাজা হয়নি। ওবামাও নীরব। আর এটিই হল মার্কিন মূল্যবোধ। এবং ওবামা সে মূল্যবোধেরই বিশ্বব্যাপী প্রসার চায়। নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিকে ওবামা ইরাক থেকে সৈন্য-অপসারণের কথা বলেছেন। কিন্তু এখন সুর পাল্টিয়েছেন। বলছেন, এ ব্যাপারে জেনারেলদের সাথে পরামর্শ করবেন। আর জেনারেলগণ তো চায় ইরাকে মার্কিনী সৈন্যের অব্যাহত উপস্থিতি। অতএব সৈন্য-অপাসারণের ঘোষণা থেকেও পিছু হঠবার বাহানা খুঁজছেন। আরো লক্ষণীয় হল, শুরুতে ইরাক-যুদ্ধের বিরোধী হলেও পরবর্তীতে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে অর্থ জোগাতে তিনি সিনেটে বার বার ভোট দিয়েছেন। জন পিলজারের ন্যায় কলামিস্টগণ ওবামার ইরাক-নীতিকে তুলনা করেছেন ষাটের দশকে ডিমোক্রাট দলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও ১৯৬৮ আতোতায়ীর হাতে নিহত রবার্ট কেনেডীর সাথে। বেঁচে থাকলে ওবামার মত রবার্ট কেনেডীও নির্বাচনে জিততেন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধীতা করতেন। তবে এজন্য নয় যে, তিনি যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। বরং এজন্য যে, ভিয়েতনামে মার্কিনীদের বিজয় অসম্ভব ছিল। ইরাক নিয়ে তেমন একটি বিশ্বাস ওবামারও। ইরাক যুদ্ধে মার্কিনীদের অর্থনাশ ও প্রাণনাশই শুধু বেড়েছে। এর ফলে অনেক রিপাবলিকান নেতাও এখন ইরাক থেকে সৈন্য অপসারণের পক্ষপাতি। কিন্তু বিজয় হাতের নাগালে এলে তাদের মতটিও পাল্টে যায়। ইরাক কিছুটা শান্ত হয়েছে। এর কারণ, মার্কিনীদের সাথে সহযোগিতা শুরু করেছে সেকুলার সূন্নীরা। মার্কিন অস্ত্র নিয়ে তারা এখন হত্যা করেছে সেসব ইসলামপন্থিদের যারা মার্কিন দখলদারীর বিরুদ্ধে এ যাবত কাল মূল লড়াইটি লড়ছিল। মার্কিনীরা কইয়ের তেলে কই ভাজার নীতি নিয়েছে। এবং সেটি কাজও দিচ্ছে। ফলে কমেছে তাদের নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি। আর এতে পরিবর্তন এসেছে মার্কিনীদের নীতি ও অভিলাষে। এখন দাবী করছে ইরাকে দীর্ঘকালীন অবস্থান ও স্থায়ী-ঘাঁটি নির্মাণের। বাগদাদে নির্মাণ করছে ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বিশাল দূতাবাস। তাই পবিবর্তন এসেছে ওবামার নীতিতেও, এখন আর তাই সত্ত্বর সেনা প্রত্যাহারের কথা তিনি মুখে আনছেন না। বরং কিছু কাল আগে ‘ইরাক সার্জ’ নামে বুশ যে সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেছিল সেটিকেই তিনি সমর্থণ করছেন। সেটিকে সফলও বলছেন। আরেকটি বিষয়, মার্কিনীদের এতবড় দূর্দিনেও ওবামার পক্ষে বিপুল বিজয় সম্ভব হয়নি। তিনি পেয়েছেন মাত্র শতকরা ৫২ ভাগ ভোট। বারাক ওবামার অর্জিত মোট ভোট সংখ্যা ৫ কোটি ৯০ লক্ষ, আর প্রতিদ্বন্ধী জন ম্যাককেইন পেয়েছেন ৫ কোটি ৩০ লক্ষ। ব্যবধান ৬০ লাখ ভোটের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত ৩০ কোটিরও বেশী মানুষের দেশে এ ব্যবধানকে কি বড় বলা যায়? অথচ ম্যাককেইন হলেন প্রেসিডেন্ট বুশের অতি কাছের। গত ৮ বছরে তিনি ৯০% সময় বুশের যুদ্ধাংদেহী সিদ্ধান্তগুলোকে সমর্থণ করে ভোট দিয়েছেন। শুরু থেকেই সমর্থন করেছেন ইরাক যুদ্ধকে। প্রয়োজনে তিনি শত বছরও ইরাকে মাকিন সৈন্য রাখার পক্ষে। এমন একজন যুদ্ধবাজ ব্যক্তিও যেখানে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়, সে দেশে নতুন প্রেসিডেন্ট ওবামা কতদূর সামনে এগুতে পারবেন? যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাঁকে ৫ কোটি ৯০ লক্ষ তথা ৪৭% ভাগ বিপক্ষ ভোটের কথা মনে রাখতেই হবে। তাছাড়া একটি দেশের সরকার পরিবর্তন হলেই নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে না। এজন্য ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন জনগণের চেতনা রাজ্যে। কিন্তু তেমন পরিবর্তন অন্যদের মাঝে দূরে থাক ওবামার নিজের মধ্যেই কতটা এসেছে? বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বর্বর ঘটনা ঘটেছে ফিলিস্তিনীদের সাথে। অথচ তারা কোন দেশ বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি। কোন যুদ্ধবাজকেও সহায়তা দেয়নি। অথচ অতিশয় নৃশংস মুছিবত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের মাথার উপর। ফিলিস্তিনের ৯০ ভাগ অধিবাসী ছিল তারা। অথচ ঘরবাড়ী থেকে বলপূর্বক বহিস্কার করে তাদের ভিটামাটি দখলে নিয়েছে ইসরাইলীরা। সেখানে এসে বসতি গড়েছে বিশ্বের নানা দেশ থেকে উড়ে আসা ইহুদীরা। সে বসতি গড়তে বিপুল আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বের ধনি ইহুদী কোম্পানীগুলো। বহু বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। আর ফিলিস্তিনীরা দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে বাস করছে উদ্বাস্তু বস্তিতে। আগ্রাসন, হত্যা, অবরোধ, জেল-জুলুম তাদের পিছু ছাড়েনি এমনকি উদ্বাস্তু শিবিরেও। যে গাজা ও জর্দান নদীর পশ্চিম তীর নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নির্মানের ওয়াদা করা হয়েছিল তা পরিণত হয়েছে উম্মূক্ত জেলখানায়। সেখানে প্রাচীর গড়া হয়েছে জেলখানার চেয়েও উঁচু করে। জেলখানার কয়েদীদের যেমন এক প্রকোষ্ঠ থেকে অন্য প্রকোষ্ঠে যাওয়ার কোন স্বধীনতা থাকে না তেমনি স্বাধীনতা নেই অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনীদেরও। সন্ত্রাস, বর্বরতা, অবরোধ, হত্যা, জবরদখলসহ সর্ব-প্রকার অমানবিক আচরণ-পূর্ণ নৃশংস বীভৎসতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ফিলিস্তিনীদের উপর। এমন নৃশংস ও নির্ভেজাল বর্বরতার নিন্দায় কি উঁচুমানের মানবিক গুণসম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? বরং ব্যক্তির নূন্যতম বিবেক ও মানবিক গুণের বিচার তো হয় এমন অমানবিক আচরণের নিন্দার সামর্থের মধ্য দিয়ে। পশুর সে সামর্থ নাই বলেই তো সে পশু। মানবতার বিচারে এ সামর্থটুকুই তো মূল; বলা যায় মানবতার লিটমাস টেস্ট। কোনটি এসিড আর কোনটি ক্ষার সেটি লিটমাস পেপার বলে দেয়। তেমনি কে মানবতা-সম্পন্ন মানব আর কে অমানব -সেটিও ধরা পড়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি কৃত নৃশংস অপরাধের নিন্দার সামর্থ থেকে। অথচ সে বিচারে ব্যর্থ হয়েছেন তথা শূণ্য মার্ক পেয়েছেন বারাক ওবামা। ওবামার বিবেকে ইসরাইলীদের সে নৃশংস অপরাধগুলী আদৌ নিন্দনীয় বিবেচিত হয়নি। অথচ সেটি জাতিসংঘ কর্তৃক বর্বরতা রূপে সনাক্ত হয়েছিল ১৯৪৮ সালেই। তাই জাতিসংঘ সেদিন ফিলিস্তিনীদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার রূপে স্বীকৃত দিয়েছিল। ইতিহাস সামনে এগিয়েছে, কিন্তু ওবামার মানবতা সামনে এগুয়নি। বরং নীচে নেমেছে। ফলে তিনি অমানবিক বলতে রাজী নন ফিলিস্তিনীদের সাথে কৃত নৃশংস অপরাধকগুলোকে। এমন মানবিক ব্যর্থতা নিয়ে তিনি আর কি সফলতা দেখাবেন? বিশ্ববাসীই বা কি আশা করতে পারে? অথচ ফিলিস্তিনে ইসরাইলী সরকার যেরূপ জেলখানার প্রাচীর গড়েছে সেটিকে বে-আইনী বলেছে হেগের আন্তর্জাতিক আদালত। কিন্তু সেটিও বে-আইনী বিবেচিত হয়েনি ওবামার কাছে। এক্ষেত্রে জর্জ বুশ থেকে তার পার্থক্য কোথায়? বরং উভয়ের নৈতিকতা যেন এক ও অভিন্ন উপাদানে গড়া। ওবামার এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। বিশ্ববাসী এবং সে সাথে মুসলিম বিশ্বের বড় আতংকের কারণ তো এখানেই। বারাক ওবামার বিশ্বাস, মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির মূল কারণ ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি নয়, বরং সেটি হল ইসরাইলকে মেনে নেয়ায় আরবদের অসামর্থতা। এর অর্থ দাঁড়ালো, ইসরাইলীদের যা ইচ্ছা তা করার অধিকার আছে। অধিকার আছে ইচ্ছামত আরব দেশ দখলের এবং সেখান থেকে মূল অধিবাসীদের বিতাড়নেরও। অধিকার আছে হত্যারও। ওবামার ভাষায় আরবদের দায়িত্ব হল, ইসরাইলী জবরদখল, ফিলিস্তিনীদের হত্যা, অবরোধ ও বিতাড়নকে স্বীকৃতি দেওয়া। কথা হল, এমন একটি পক্ষপাত-দুষ্ট অতি উগ্র বিশ্বাস নিয়ে কেউ কি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে? পারে কি বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে? শান্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে অতি অপরিহার্য প্রথম শর্ত্ব হল, মধ্যস্থতাকারীর নিরেক্ষপতা এবং অন্যায়কে অন্যায় রূপে সনাক্ত করার সামর্থ। সে সামর্থ এ যাবত কাল কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই ছিল না। নেই বারাক ওবামারও। ফলে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠার সকল উদ্যোগ। এ যাবতকাল অনুষ্ঠিত সকল বৈঠক এবং সকল আলোচনাই এ কারণে ব্যর্থ হয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রচারকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ইহুদী লবিগ্রুপ ‘আইপ্যাক’এর মিটিংয়ে বারাক ওবামা যা বলেছেন সেটি আরো উদ্বেগজনক। সে মিটিংয়ে ওবামা নিজেকে ইসরাইলের অতি ঘনিষ্ট বন্ধুরূপে ঘোষণা দেন। এভাবে নিজেকে পরিচিত করেছেন ইসরাইলের প্রতি অতি অঙ্গিকারবদ্ধ ও নিষ্ঠাবান উকিলরূপে। অপর দিকে ইসরাইলে গিয়ে বলেছেন, জেরুজালেম থাকবে অবিভক্ত এবং সেটি থাকবে ইসরাইলের রাজধানীরূপে। অথচ এমন কথা আন্তজার্তিক আইন-বিরুদ্ধ। জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী জেরুজালেম শহরেই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী। এমনকি সেটি মেনে নিতে রাজী বহু চরমপন্থি ইসরাইলীও। অথচ বারাক ওবামা চরমপন্থি ইসরাইলীদের চেয়েও অধিক চরমপন্থি রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। এত সুস্পষ্ট পক্ষপাতের পরও কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থ্যতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার যোগ্যতা থাকে? থাকে কি সে অধিকার বা গ্রহণযোগ্যতা? কথা হল, এটি কি শান্তির পথ? ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর কেটে গেছে। শান্তির প্রতিষ্ঠার নামে বহু মধ্যস্থ্যতা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু কথা হল, এরূপ ইসরাইল-তোষণ মানসিকতা নিয়ে মার্কিন মধ্যস্থতা শত শত বছর চললেও কি শান্তি প্রতিষ্ঠা পাবে? প্রতিদিন বৈঠক বসলেও কি তাতে লাভ হবে? ওবামার এরূপ মানসিকতায় অশান্তিই কি আরো তীব্রতর হবে না? অথচ বিশ্ব-শান্তির পথে এটিই তো মূল বাধা। শান্তির নামে মার্কিনী প্রশাসন ও পশ্চিমাবিশ্ব এ যাবতকাল ফিলিস্তিনীদের নাকের ডগার সামনে শুধু মূলা ঝুলিয়ে রেখেছে। আলোচনার পর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এ যাবত সেগুলো হয়েছে নিছক ধোকা দেওয়ার জন্য। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এটি হল, নীতির ক্ষেত্রে মার্কিনীদের বড় অসততা। কথা হল, যে পক্ষপাত-দুষ্ট মানসিকতা নিয়ে বারাক ওবামা হাজির হয়েছেন তা থেকেই কি ভিন্নতর কিছু আশা করা য়ায়? পুরনো ধোকাবাজীই কি আবার নতুন করে শুরু হবে না? যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও জুলুমবাজীতে কি আবার নব-উদ্যোমে উৎসাহ দেওয়া শুরু হবে? ইসরাইলকে কি জোগানো হবে আরো মার্কিন যুদ্ধাস্ত্র? আর সেটি ফিলিস্তীনের মজলুম জনগণ কি মেনে নিবে? জ্বিহাদই কি এতে তীব্রতর হবে না? এতে শান্তির চেয়ে অশান্তিই কি বাড়বে না? অথচ তেমন একটি ধারণাই প্রবল হয় বারাক ওবামার আশে-পাশের লোকদের দিকে তাকালে। কোন ব্যক্তি মুখে যাই বলুক, আসল পরিচয় ধরা পড়ে তার বন্ধুদের দেখলে। কারণ, বন্ধু নির্বাচনে মানুষ তার অতিশয় আপন ও সমমনা লোকদেরই প্রাধান্য দেয়। আর সেটি সত্য ওবামার ক্ষেত্রেও। বারাক ওবামা তার প্রশাসনিক দলে প্রথম যে লোকটিকে বেছে নিয়েছেন সে হল অতি পরিচিত জায়োনিষ্ট বা ইহুদীবাদী। এসেছে ইসরাইল থেকে। তার নাম রাহম ইমানুয়েল। এ ব্যক্তিটি ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনেরও পরামর্শদাতা। তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে হোয়াইট হাউজের চিফ-অব-স্টাফ রূপে। মি. ইমানুয়েলের পিতা ছিল চল্লিশের দশকের চরমপন্থি ইহুদী সন্ত্রাসী। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিনাখেম বেগিনও ছিল সে সন্ত্রাসী দলের একজন। তারা সন্ত্রাসী হামলা করত ফিলিস্তিনের নিরীহ মুসলিম নাগরিকদের উপর, এবং তাদেরকে বাধ্য করত নিজ ঘরবাড়ী ও দোকানপাট ত্যাগে। মি. ইমানুয়েল নিজেও কাজ করেছে ইসরাইলী সেনাবাহিনীতে। তাই মনে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে দল-বদল, ব্যক্তি-বদল বা রঙের বদল হলেও নীতির বদল হওয়ার সম্ভাবনা সামান্যই। ২০ই জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পর তিনি আরো সৈন্য পাঠাবেন আফগানিস্তানে। যুদ্ধ শুরু হয়েছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও। বিন লাদেনকে ধরতে বারাক ওবামা পাকিস্তানে যাবেন সে ঘোষণাও দিয়েছেন। ভারত ও ইসরাইল চাইবে, বোমা যখন ফেলাই হচ্ছে, এ সুযোগে কিছু বোমা ফেলা হোক পাকিস্তানের আণবিক প্রকল্পের উপরও। এভাবে বিলুপ্ত হোক আণবিক শক্তিধর একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্রের। বহু মার্কিন নীতি-নির্ধারকেরাও সেটিই চায়। ওবামা আপোষহীন ইরানের বিরুদ্ধেও। ইতিমধ্যে গোপন যুদ্ধ শুরু হয়েছে সেখানেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ কাজে বেছে নিয়েছে তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে ঘোষিত সন্ত্রাসী দল “মোজাহিদীনে খালক”কে। ফলে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জর্জ বুশ যে ক্রসেড শুরু করেছিলেন সেটি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং সেটিকে আরো তীব্রতর, বিস্তৃততর ও রক্তাত্ব করার পথে ওবামা আর কতদূর এগুবেন - সেটিই এখন দেখার বিষয়। ০৮/১১/০৮
|
Sk Mujib er moto ek "Dictator" kibhabe jatir pita hoi ?