|
Sunday, 30 November 2008 17:43 |
মুম্বাইয়ে বন্দুকধারিদের সাথে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াই শেষ হয়েছে। তবে এ খন্ড লড়াইটি শেষ হলেও যে যুদ্ধটি শুরু হল তা কি শেষ হবে? মুষ্টিমেয় কয়েকজন বন্দুকধারি যা ঘটিয়ে গেল তা যেমন অভিনব তেমনি বিস্ময়কর। তারা প্রসিদ্ধ তাজমহল ও ওবেরয় হোটেল, শিবাজী রেলস্টেশন, ইহুদী সেন্টারসহ ৭টিরও বেশী স্থান দখলে নিয়েছিল। বলা হচ্ছে, সংখ্যায় তারা ছিল মাত্র ১৪ জন। তবে সঠিক তথ্য এখনও আসেনি। হামলাকারিদের মধ্যে মাত্র একজনকে তারা জীবিত ধরতে পেরেছে। বলা হচ্ছে সে নাকি পাকিস্তানী। বিশাল সামরিক বাহিনী, বহু আণবিক বোমা বা চাঁদে রকেট পাঠানোর সামর্থ থাকলে কি হবে, সামান্য কয়েকজন বন্দুকধারির অধিকার থেকে হোটেল দুটিকে মুক্ত করতে ভারতের তিন দিন লেগে যায়।
ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী যে কতটা দূর্বল ও অসহায়, তাদের কৌশল যে কতটা সেকেলে ও মামূলী সেটিই এবার প্রকট ভাবে ধরা পড়লো। দিল্লি থেকে কমান্ডোদের আসতেই ৬ ঘন্টার বেশী লেগে যায়। তাদের এলোপাথারী গুলিতে মারা পড়েছে আটকা পড়া বহু নাগরিক। ভারত সরকারের এ ব্যর্থতা ঢাকতে পদত্যাগ করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শিবরাজ প্যাটেল এবং সে সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা। গুরুত্বপূর্ণ হল, এটি হামলার শুরু যেমন নয়, সম্ভবতঃ শেষও নয়। বন্দুকধারিরা ঘোষণা দিয়েছিল, তারা “ডেকান মোজাহিদীন” সংগঠনের সদস্য। দাবী করেছিল, ভারতের জেল থেকে গ্রেফতারকৃত মুসলমানদের মুক্তি এবং কাশ্মিরে ভারতীয় দখলদারির অবসান। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঘোষণা, এ হামলায় নিহত হয়েছে ১৯৫ জন। আহত হয়েছে ৩০০জন। নিহতের মধ্যে ২২জন বিদেশী। এটি এখন সুস্পষ্ট, বন্দুকধারিদের লক্ষ্য তাজমহল ও ওবেরয় হোটেলে আটকা পড়া শত শত জিম্মিদের হত্যা ছিল না। সেটি লক্ষ্য হলে আরো বহু শত মানুষকে তারা হত্যা করতে পারত। সেটির জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারু এবং সময়ও ছিল। প্রশ্ন হল, জীবন দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে যারা হামলা করে তাদের লক্ষ্য কি নিছক কিছু মানুষ হত্যা ও কিছু স্থানকে কয়েক ঘন্টা দখলে রাখা? হামলার লক্ষ্য নিশ্চয়ই ভিন্ন কিছু। নিউয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ১১ই সেপ্টম্বরে যারা হামলা করেছিল তারাও নিশ্চয় নিজেদের প্রাণটি নিছক টুইনটাওয়ার ও পেন্টাগণ ধ্বংসে দেয়নি। সে লক্ষ্যটিও ছিল সুদুর প্রসারি। সিংহের গায়ে তীর ছুড়লে আহত সিংহটি যেমন গর্জন করতে করতে গুহা থেকে বেড়িয়ে সামনে যাকে পায় তার উপরই হামলা করে, ১১ই সেপ্টম্বরের হামলায় তেমনি একটি অবস্থা সৃষ্টি করেছিল হামলাকারিরা। আহত সিংহের ন্যায় মহাসমুদ্রে ঘেরা নিরাপদ আবাসস্থল ছেড়ে মার্কিন সৈন্যরা উপনিত হয়েছে হাজার হাজার মাইল দূরের পাহাড়-পর্বতে পরিপূর্ণ দুর্গম আফগানিস্তানে। বিগত ৭ বছর তারা আটকা পড়ে আছে সেখানে। পৌঁছেছে ইরাকে। এভাবে হামলাকারিদের জালে ধরা দিয়েছে মার্কিনীরা। উভয় দেশেই তাদের বিজয় অসম্ভব। এ যুদ্ধ কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে মার্কিন অর্থনীতির। লোপ পেয়েছে বিশ্বশক্তি রূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টিকে থাকার সামর্থ। শুধু মার্কিন রাজনীতিই নয়, এতে বহুলাংশে পাল্টে গেছে বিশ্ব-রাজনীতিও। ইরান ও সিরিয়া যে এখনও অক্ষত আছে তা তো এ পরিবর্তিত বিশ্ব-রাজনীতির কারণে।
মুম্বাইয়ের উপর হামলাটিও ভারতের জন্য পরিণত হতে যাচ্ছে ১১ই সেপ্টম্বরে। সেটি বোঝা যায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঘোষণা থেকে। এমনই এক ঘোষণা দিয়েছিলেন ১১ই সেপ্টম্বরের ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। আফগানিস্তানের উপর হামলার মার্কিন পরিকল্পনা শুরু হয় তখন থেকেই, যদিও কোন আফগান নাগরিক সে হামলায় জড়িত ছিল না। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীও সন্দেহের অঙ্গুলি এবং সে সাথে কড়া হুশিয়ারি শুনিয়েছেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এতে উত্তেজনার মাত্রা প্রকটতর হচেছ দুই দেশের মাঝে। নির্বাচনে পিপলস্ পার্টির বিজযের পর পাকিস্তানের সরকার ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকটতম হতে। আদর্শগত দিক থেকে ভারতীয় কংগ্রেসের সাথে পিপল্স পার্টির পার্থক্য সামান্যই। উভয় দলই সেকুলার। পিপল্স পার্টি মূল শত্রুতা পাকিস্তানের ইসলামপন্থিদের সাথে। দলটির নেতাদের বিশ্বাস, তাদের নেত্রী বেনজির ভূট্টোর মৃত্যু হয়েছে ইসলামী চরমপন্থিদের হাতে। তাদের এটিও বদ্ধমূল বিশ্বাস, ইসলামপন্থিদের সাথে এ লড়ায়ে তাদের একার পক্ষে বিজয় অসম্ভব। তাই চায় আন্তর্জাতিক মিত্র। এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সে সাথে ভারতের সাথে পিপল্স পার্টির নেতাদের শুরু হয় ঘনিষ্টতা। দেশে ফেরার আগে বেনজির ভুট্টোর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, পিপল্স পার্টি ক্ষমতায় গেলে তালেবানদের হত্যায় মার্কিন বাহিনীকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দিবে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর পিপল্স পার্টি সে অধিকার দিয়েছেও। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলা এখন তাই প্রতিদিন। বলা হয়ে থাকে, প্রেসিডেন্ট মোশাররফের আমলে বেনজির ভূ্ট্টো দেশে ফিরার সুযোগ পেয়েছিল মার্কিন চাপে। কারণ মোশাররফ যা দিতে রাজী ছিল না, তাতে রাজী ছিল বেনজির। তার স্বামী আসিফ জারদারীর বিরুদ্ধে ছিল দূর্নীতির মামলা। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে তার ছিল বহু মিলিয়ন ডলার। মামলা যেমন প্রত্যাহার করা হয়েছে তেমনি তুলে নেওয়া হয়েছে দূর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ তুলে নেওয়ার উপর থেকে বিধি-নিষেধ। আসিফ জারদারী এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। তার আমলেই পাকিস্তান আর্মি প্রকান্ড যুদ্ধ ঘোষণা করেছে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। এ যুদ্ধে বহুহাজার তালেবানপন্থিকে হত্যা করা হয়েছে, বহ লক্ষ মানুষকে করা হযেছে উদ্বাস্তু। যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটাতে দেশটি দেউলিয়া এখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। দেউলিয়া থেকে বাঁচতে উচ্চ সূদে ৭ বিলিয়ন ডলার ধার নিতে হয়েছে আইএমএফ থেকে।
শুধু ইসলামপন্থিদের মোকাবেলার জন্যই নয়, সামরিক ব্যয়ভার কমানোর তাগিদেও পিপল্স পার্টি চাচ্ছিল ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে। কিন্তু এ হামলার পর অসম্ভব হবে সে ঘনিষ্টতা। ফলে ধাক্কা খাবে উপমহাদেশের সেকুলারিষ্টদের ইসলামবিরোধী কোয়ালিশন। বরং পাকিস্তানী নেতাদের আশংকা বেড়েছে, মুম্বাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হতে পারে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। তেমন শংকার অবস্থা বুঝা যায় সে দেশে ২৯/১১/০৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে তাড়াহুড়া করে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠকে। বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, পাকিস্তানের উপর হামলা হলে সে হামলা রোধে নিঃশর্ত সমর্থণ দিবে সরকারকে। ফলে সংহতি এসেছে পাকিস্তানের রাজনীতিতে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান তার সীমান্ত এলাকার যুদ্ধ বন্ধ করে ভারত সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশের চিন্তা ভাবনা শুরু করেছে। আর সেটি হলে চাপ কমবে সীমান্ত প্রদেশের তালেবানদের উপর থেকে। আর এতে শক্তি হারাবে যুক্তরাষ্ট্রের তালেবান বিরোধী যুদ্ধ। তবে এটিও ঠিক, বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতিতে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র হওয়াটাই বিপদ ডেকে আনার যথেষ্ট। একই কারণে বিপদের মুখে এখন আফ্রিকার সবচেয়ে বৃহৎ রাষ্ট্র সূদান। সেখানে সৃষ্টি করা হয়েছে দারফোরের বিচ্ছিন্নতার ঘটনা। এক্ষেত্রে পাকিস্তান শুধু বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রই নয়, পঞ্চাশটির বেশী মুসলিম রাষ্ট্রের মাঝে আণবিক অস্ত্রধারি সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। শুধু ভারত নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ইসরাইলসহ বিশ্বের প্রায় সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের কাছেই অতি কামনার বিষয়, এমন পাকিস্তানের আশু বিলুপ্তি।
সমস্যা হল, এ সময় এতটাই ব্যয়বহূল যে যুদ্ধের ব্যয়বহুল কোন দেশই একাকী মেটাতে পারে না। ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে ক’দিনের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এজন্যই পার্টনার খুঁজতে হয়েছে। ২০০১ এবং ২০০৩ সালে আফগানিস্তান ও ইরাক যু্দ্ধে সেরূপ পার্টনার জুটেনি বলেই কোমর ভেঙ্গেছে মার্কিন অর্থনীতির। একই কারণে আফগানিস্তানের যুদ্ধে পরাজিত এবং বিলুপ্ত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া। সম্ভবতঃ ভারতও সে দিকেই এগুচ্ছে। ভারতে ইতিমধ্যে দুটি বিপুল ব্যয়বহুল যুদ্ধ লড়ছে। একটি কাশ্মিরে এবং অপরটি নাগাল্যান্ড, মনিপুর, আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম এলাকা জুড়ে। কাশ্মিরের আটকা পড়ে আছে প্রায় ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্য। এ যুদ্ধদুটিতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে প্রতি বছর। যুদ্ধ চলছে তিরিশ বছর ধরে, শেষ হওয়ারও কোন সম্ভাবনা নাই। একটি দেশের বিপর্যয় বাড়াতে এমন একটি লাগাতর রক্তক্ষরণই কি যথেষ্ট নয়? এ অবস্থায় শত্রুদেশের একটি তীর ছোড়ারও প্রয়োজন আছে কি? এরপরও ভারত লাগাত বিষোদগার করে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে। ভারতের কোন স্থানে কোন বোমা বিস্ফোরিত হলে বা সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে দায়ভার পাকিস্তানের উপর চাপানো হয়। এখন পাকিস্তানের সাথে যোগ করছে বাংলাদেশের নামও। এ জন্য কোন তদন্তের প্রয়োজন মনে করে না। দোষারপমুলক একটি বিবৃতি যেন পূর্ব থেকেই তৈরী থাকে। এবারেও কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে এবারে দোষারপে সমর্থক হিসাবে কাছে পেয়েছে পশ্চিমা দেশগুলিকে। তাই শুধু ভারতীয় পত্র-পত্রিকাতেই নয়, সমগ্র পশ্চিমা মিডিয়াতে এ কথা ফলাও করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, হামলাকারিরা এসেছে পাকিস্তানের করাচী বন্দর থেকে। তারা জড়িত করছে পাকিস্তানীদের সংগঠন লস্করে তাইয়েবাকে। আরো বলছে, লস্করে তাইয়েবা পাকিস্তানের গো্য়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ফ্রন্টলাইন অর্গানাইজেশন। অভিযোগ আনছে পাকিস্তান আর্মীর বিরুদ্ধেও। এটি এক গুরুতর অভিযোগ। শত্রু-দেশে হামলার জন্য এমন একটি অভিযোগ খাড়া করাই কি যথিষ্ট নয়? ইরাকের বিরুদ্ধে হামলা এবং দেশটি দখলে নেওয়ার জন্য মার্কিনীদের এমন একটি ভূয়া অভিযোগের অতিরিক্ত বেশী কিছুর প্রয়োজন পড়েনি। ভারতও এমন একটি অভিযোগকেই বিশ্বময় প্রচার করছে। তারা নাকি করাচী থেকে এসেছিল একটি বাণিজ্যিক জাহাজে করে। ভারত যদি এ বাহানায় পাকিস্তানের উপর হামলা করে তবে সে হামলায় সকল প্রকার সহায়তা দিবে পশ্চিমা বিশ্ব। ইতিমধ্যে পশ্চিমা সরকারগুলো একাত্মতা ঘোষণা করেছে ভারত সরকারের সাথে। এ হামলাকে তারা বলছে তাদের নিজেদের উপর হামলা। ভারতীয় সরকারকে সহায়তা দিতে ইতিমধ্যে ইসরাইল, ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা পাঠনোর ঘোষণা দিয়েছে। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ধরে পশ্চিমা টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে মুম্বাইয়ের তাজমহল হোটেলের জলন্ত চিত্রকে। যেন ভারতীয় ইতিহাসে এটিই সন্ত্রাসের একমাত্র ঘটনা। অথচ যখন গুজরাটে দুই সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করা হল, হত্যার পূর্বে শত শত মানুষকে যখন আগুনে ফেলা হল, ধর্ষণ করা হল শত শত মুসলিম নারীকে তখন কিন্তু সে চিত্র পশ্চিমা টিভিতে দেখানো হয়নি। টিভিতে দেখানো হয়নি হাজার হাজার উগ্র হিন্দুদের হাতে দিন-দুপুরে বাবরী মসজিদটিকে ধুলিস্মাৎ করার চিত্রটি। দেখানো হয়নি ভারতীয় বাহিনীর হাতে গত তিরিশ বছর ধরে কাশ্মিরে লক্ষাধিক মানুষ হত্যার চিত্র। বসনিয়ার দুই লাখ মানুষকে হত্যা করা হল বহু মাস ধরে, সে চিত্রও পশ্চিমা বিশ্ব এতটা গুরুত্ব পায়নি। তাদের বাঁচাতে কার্যকর কোন সাহায্যও পাঠনো হয়নি। বরং সার্বেনিৎসার জাতিসংঘের দফতর থেকে ৬ হাজার মানুষকে সার্ব ঘাতকদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে বধ্যভূমিতে নেওয়ার জন্য। যেন মুসলিম হত্যার এরূপ ঘটনাগুলি কোন সন্ত্রাসই নয়। যেমন সন্ত্রাস নয় মার্কিন যুদ্ধ বিমান থেকে আফগানিস্তান ও ইরাকে নিরীহ গ্রামবাসীর উপর বোমা বর্ষন ও লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ হত্যার বর্বর ঘটনাগুলি।
প্রশ্ন হল, ভারতীয় হিন্দুদের সাথে পাশ্চাত্যের এতটা একাত্ম হওয়ার কারণ কি? কারণ, পাশ্চাত্য এখন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতীয় হিন্দুদের ঘনিষ্ঠ মিত্র রূপে পেতে চায়। প্রফেসর হান্টিংটন তার “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” বইতে সে পরামর্শই রেখেছেন। আর মার্কিন প্রশাসন সে লক্ষ্যেই ভারতের সাথে সম্পর্ককে আরো মজবুত করছে। পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ এক সময় শত্রুর আসনে বসিয়েছিল কম্যুনিজম ও সোভিয়েত রাশিয়াকে, এখন সে আসনে বসিয়েছে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে। ভারতের সাথে সম্পর্ক মজবুত করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি দেশটির সাথে সম্পাদন করেছে আনবিক শক্তির ক্ষেত্রে সহাযোগিতা চুক্তি। এমন চুক্তি তারা পাকিস্তানের সাথে করতে রাজী নয়, অন্য কোন মুসলিম দেশের সাথেও নয়। লক্ষণীয়, সোভিয়েত রাশিয়ার জীবদ্দশাতে ভারত ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার ঘনিষ্টতম মিত্র। দেশটি যখন আফগানিস্তান দখল করে তখন ভারত সে আগ্রাসনে সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছিল। ভারত যখন ১৯৬৫ ও ১৯৭১-য়ে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন সোভিয়েত রাশিয়া সর্বপ্রকার সমর্থণ দেয় ভারতকে। বার বার ভেটো দিয়েছে কাশ্মির প্রশ্নে। সোভিয়েত রাশিয়া বিলুপ্ত হয়েছে, আর ভারত পাল্টিয়েছে তার কিবলা। এখন ধরেছে মার্কিনী নীতি। সে মার্কিনী নীতি সমর্থন করতেই ভারত আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনে সর্বপ্রকার সমর্থন দিচ্ছে। দিল্লিতে অবস্থানরত হামিদ কারজাইকে বসানো হয়েছে কাবুলের পুতুল সরকারের প্রধান রূপে। ফলে যে যু্দ্ধ জিহাদী মুসলমানদের দ্বারা শুরু হয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তা এখন মোড় নিচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধেও। আর ভারত এভাবেই যুদ্ধ ডেকে এনেছে নিজ-দেশের অভ্যন্তরে।
ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা নিজের শত্রু চিনতে। দেশটির শাসকচক্র মনে করে তাদের শত্রু পাকিস্তান। এখন বাংলাদেশ এবং নেপালকেও সে দলে ফেলছে। অথচ ভারতের মূল শত্রু ভারত নিজেই। শুধু অর্থনৈতিক, সামরিক বা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে একটি দেশ চলে না, উন্নয়নের অধিক প্রয়োজন হল সামাজিক ও মানবিক ক্ষেত্রে। সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের বলেই দরিদ্র মানুষও উন্নত সভ্যতার জন্ম দেয়। অথচ এটি না হলে একটি সমৃদ্ধ দেশও ভেঙ্গে যায়। মোগল সাম্রাজ্য তো ধ্বসে গেল তখন যখন মানব-উন্নয়ন ছেড়ে তারা তাজমহল নির্মানে নেমেছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানগণ যখন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দেয় তখন তাদের প্রাচুর্য্য ছিল না। সেদিন সর্বাধিক বিণিয়োগ হয়েছিল মানবিক উন্নয়নে। কোরআনের প্রথম আয়াতটিতে যে তাগিদটি দেওয়া হয়েছিল সে নামায পড়ায় নয়। বরং সে নির্দেশটি ছিল মানব-উন্নয়নে বিণিয়োগটি বাড়াতে। বলা হয়েছিল “ইকরা” অর্থাৎ পড়। বলা হয়েছিল জ্ঞানার্জন করতে। ফলে বেড়েছিল জ্ঞান, বেড়েছিল মানবিক গুণ। ফলে প্রাচুর্য্য বেড়েছিল মানবতায়। সেদিন নারীরা মুক্তি পেয়েছিল, বিলুপ্ত হয়েছিল দাসপ্রথা। নির্মূল হয়েছিল বর্ণ, গোত্র ও ভাষাভিত্তিক বিভক্তি এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ন্যায়বিচার। মাটির ঘরের সে মানুষগুলো সেদিন মানবিক গুণে ফেরেশতাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছিলেন। অথচ ভারত সে দিকে তেমন উদ্যোগই নেয়নি। দেশটি প্রচন্ড বিণিয়োগ বাড়িয়েছে সামরিক ক্ষেত্রে, শিক্ষা বা মানবিক গুণ বাড়াতে নয়। সোভিয়েত রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ সামরিক বাহিনী গড়েও বাঁচতে পারিনি। অথচ ভারত তা থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। ভারতে সবচেয়ে বড় বঞ্চনার শিকার সেদেশের সংখ্যালঘু মুসলমানেরা। মুসলমানগণ ভারতে প্রায় ১৬ কোটি, মূল জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ১৪ ভাগ। এ সংখ্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী। কথা হল, দেশের এতবড় একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে পশ্চাদপদ রেখে কোন জাতি কি সামনে এগুতে পারে? পারে কি শান্তিময় পরিবেশ গড়তে? মুসলিম জনগোষ্ঠীর পশ্চাদপদতা সে দেশের নিম্ম বর্ণের দলিত হিন্দুদের চেয়েও অধিক। সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ২ ভাগও নয়। ভারতের ন্যাশনাল কমিশন অব মাইনরিটিজ সম্প্রতি সাচার রিপোর্ট নামে একটি প্রতিবেদন বের করেছে। সে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী মুসলিম শিশুদের শতকরা ২৫ ভাগ হয় আদৌ কোনদিন স্কুলে যায়নি বা গেলেও স্কুল থেকে সত্বর বিদায় নিয়েছে। দেশের জনসংখ্যার ১৪% ভাগ মুসলিম হলে কি হবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শতকরা মাত্র ৫ ভাগ ছাত্র হল মুসলমান। এতে বাড়ছে মুসলমানদের মাঝে বঞ্চনার তীব্র অনুভূতি। সে সাথে রয়েছে দাঙ্গার নামে মুসলিম হত্যার নিয়মিত নৃশংস ঘটনা। ভারত প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ অবধি এমন দাঙ্গা ঘটেছে বহু হাজার বার। একটি দায়িত্বশীল সরকারের বড় দায়িত্ব হল, দূরের গ্রামের কোন নির্ভৃত কোণে খুন বা ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও সত্বর অপরাধীকে খুজে বের করা এবং তার বিরুদ্ধে বিচার এবং বিচার শেষে শাস্তির ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে কি তাকে সফল রাষ্ট্র বলা যায়? কিন্তু ভারতের ব্যর্থতা এ ক্ষেত্রে বিকট। দিন-দুপুরে পুলিশের চোখের সামনে মানুষ খুণ হচ্ছে, মসজিদ ধ্বংস হচ্ছে, গীর্জা পুড়ানো হচ্ছে, দোকান-পাটে আগুন দেওয়া হচ্ছে -কিন্তু কোন অপরাধীর শাস্তি হচ্ছে না। গুজরাটের দাঙ্গার দুই হাজার মানুষ নিহত হল, অসংখ্য নারী ধর্ষিতা হল। কিন্তু ভারত সরকার কি পেরেছে কাউকে শাস্তি দিতে?
দেশে প্রচুর রাস্তাঘাট ও কলকারখানা তৈরী করলেও ভারত সরকার বিণিয়োগ বাড়ায়নি বিরাজমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে। সেদেশের গরীব মানুষ দিন দিন আরো নিঃস্ব হচ্ছে। ভারত তার অর্থনীতি নিয়ে গর্ব করে। অথচ দেশটিতে বাস করে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠী। সরকারের আরেক কাজ, মানুষের মাঝে বিভেদের বদলে বন্ধন গড়া। কিন্তু সে কাজটিও হয়নি। বিরোধ বা বিভাজন শুধু মুসলমানদের সাথে হিন্দুদের নয়, বরং নানা জাতপাতে বিভক্ত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাও। হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দুগণ যেভাবে জাতপাতে বিভক্ত থেকেছে, আজও সেটিই দেশের নীতি। এভাবে কি রাজনৈতিক সম্পৃতি গড়ে উঠে? নীচের তলার মানুষ কি এতে শান্তিপূর্ণ ভাবে উপরে উঠতে পারে? এমন অবস্থায় বঞ্চিত মানুষের সামনে মাত্র দুটি পথই খোলা থাকে। হয় সন্ত্রাস, না হয় আত্মহত্যার। আর এ দুটির সংখ্যা ভারতে সর্বাধিক। এক সমীক্ষায় প্রকাশ, ভারতে ধার পরিশোধ করতে না পেড়ে যত গরীব কৃষক আত্মহত্যা করে তত আত্মহত্যা সমগ্র বিশ্বেও হয় না। আত্মহত্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নকশালবাড়ী আন্দোলন। ভারতের বিহার, ঝাড়খন্ড, অন্ধপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও শতিষগড়ে সশস্ত্র এ আন্দোলন এতটাই তীব্র যে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ী ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ছে এসব সন্ত্রাসীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ। এতে বিশাল এলাকা পরিণত হয়েছে এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষ মারা পড়ছে ক্রসফায়ারে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। এমন এক বীভৎস চিত্র সম্প্রতি দেখিয়েছে টিভি চ্যানেল আল-জাজিরা। এ সন্ত্রাস ভারতের জন্য যে কতটা ভয়ানক সে ঘোষনা এসেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং থেকে। তিনি এটিকে বলেছেন ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বিষয়ক হুমকী। এরপর বোম্বাই হামলা যোগ করল এ ভয়ানক নতুন উপসর্গ। এর প্রভাব পড়বে ভারতের পুঁজি বাজারে। অনেক বিণিয়োগকারিই ভারতকে আর নিরাপদ স্থান রূপে মনে করবে না। বিণিয়োগের বদলে শুরু হতে পারে পুঁজি প্রত্যাহারের হিড়িক। অপরদিকে শুধু পাকিস্তান নয়, কোন প্রতিবেশী দেশের সাথেই ভারতের নাই সুসম্পর্ক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত ঢুকছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষিবাহিনী, তাদের হাতে মারা যাচ্ছে বাংলাদেশী নারী-পুরুষ ও শিশু। বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠা নতুন দ্বীপ তালপট্টির উপর ভারত ঘোষনা দিয়েছে এক তরফা নিজ দখলদারির। তেল খুঁজছে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার মধ্যে ঢুকে। বিবাদ বেধেছে নেপালের নির্বাচিত বামপন্থি মাওবাদী সরকারের সাথেও। ভারতের অভিযোগ, তারা কেন চীনের সাথে এত উঠাবসা করে। চীন দিচ্ছে তাদের প্রতিরক্ষা সামগ্রী। সম্প্রতি ৪ জন নেপালী মন্ত্রী একত্রে স্থলপথে চীনে গিয়েছিলেন। ভারতীয় সরকার ও সেদেশের পত্র-পত্রিকা এ খবরে প্রচন্ড উত্তেজিত। সুস্পর্ক নেই শ্রীলংকার সাথেও। এ অবস্থায় নিজের ঘর সামলাতে কি পাবে প্রতিবেশীর সহায়তা? ভারত আবির্ভূত হতে চাচ্ছে এ এলাকার বৃহৎ শক্তিরূপে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন অন্য দেশের রাজনীতি নিয়ে নাকগলায়, ভারত সেটিই করছে প্রতিবেশী দেশের রাজনীতি নিয়ে। ভারত বলছে, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে কোন ইসলামপন্থি সরকারকে তারা মেনে নিবে না। সে নীতি আফগানিস্তানের প্রতিও। এবং এ কথাটি তারা প্রকাশ্য্ই বলে। অথচ কারা ক্ষমতায় আসবে এবং কি হবে তাদের নীতি -সেটি তো একটি দেশের আভ্যন্তরীন বিষয়। কোন স্বধীন দেশ কি ভারতের এ নীতি মেনে নিতে পারে? এটি এক প্রচন্ড দাদাগিরি। ফলে অতিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের জনগণও। দুরন্ত হাতির পা গর্তে পড়লে অন্যরা খুশি হয়, তেমন অবস্থা প্রতিবেশী দেশগুলির। প্রতিবেশী দেশের সাথে সু-আচরণ দূরে থাক, নিজ দেশের বিহার ও উত্তর প্রদেশের প্রবাসী শ্রমিকগণ ক’দিন আগেও প্রচন্ড মারপিট ও গলাধাক্কা খেয়েছে মুম্বাই শহরে। মুম্বাইয়ে এবার যেটি ঘটলো সেটি ঢাকায় ঘটলে বাংলাদেশেকে সোমালিয়ার ন্যায় একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র রূপে ঘোষণার দাবী আসতো সম্ভবতঃ ভারত সরকারের পক্ষ থেকেই। হয়ত দাবী তুলতো বিদেশী সৈন্য মোতায়েনের। ভারত হয়ত নিজেই দাবী তুলতো নিজ সৈন্য পাঠানোর। অথচ ভারত আজ নিজেই সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। ৩০/১১/০৮
Bookmark this,
|
|
Yes I will feel happy because India doesn't want his neighbors become prosperous country.
Would you feel happy if India becomes a failed state?