Bookmark and Share
Home আন্তর্জাতিক আত্মঘাতের পথে ভারত

eBook Collection

সর্বাধিক পঠিত

আত্মঘাতের পথে ভারত Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 20 December 2008 20:45
লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকায় ১৪ই ডিসেম্বর ২০০৮ সংখ্যায় অরুন্ধতি রায় মুম্বাই হামলার প্রেক্ষাপটে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর কথা, ভারত এখন দুই রাস্তার মোহনায় দাঁড়িয়ে- একটি সুবিচারের এবং অপরটি গৃহযুদ্ধের। সামনে তৃতীয় পথ নেই। তবে ভারত সরকার যে পথটি অনুসরণ করছে সেটি অবিচারের। এমন অবিচার যেটি বৃদ্ধি করে সেটি সম্পৃতি নয়, বরং সংঘাত। ভারত সরকার জেনে বুঝে যেন সে পথই অনুসরণই করছে। অবিচার এতটাই আকাশচুম্বি যে সে অবিচার থেকে বাঁচতে লাখ লাখ মানুষ দেশটিতে আত্মহত্যা করে। ২০০৭ সালের মাত্র এক বছরে আত্মহত্যা করেছে এক লাখ ৮ হাজার দরিদ্র কৃষক। একটি দেশের মানুষ যেখানে অবিচার থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করে, সে দেশ নিজেও কি বাঁচতে পারে? এতকাল এ অবিচারকে সহনীয় করতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আগের জন্মে খারাপ কাজ করায় ভগবান তাদেরকে দুর্দশাগ্রস্ত রূপে জন্ম দিয়েছেন।

কিন্তু সে ব্যাখ্যা এখন মানুষ মানতে রাজী নয়, অবিচারের বিরুদ্ধে তারা অস্ত্র তুলে নিয়েছে। ফল দাড়িয়েছে, ৬০৮টি জেলার মধ্যে ২৩১টিতে তুমুল আকার ধারণ করেছে নকশাল আন্দোলন। ভারত সরকারের সামনে এটি এক বড় রকমের নিরাপত্তা সমস্যা। ভারতের হিন্দু রাজনৈতিক নেতাগণ অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্যকে ভূলে যায়। সে অজ্ঞতাটিই এখন ভারতের জন্য আত্মঘাতি প্রমাণিত হচ্ছে। সে সত্যটি হল, ভারত চীন নয়। আমেরিকাও নয়। পাকিস্তান বা বাংলাদেশও নয়। পাকিস্তানের ৯৮% ভাগ মানুষই মুসলমান। সে সংখ্যা বাংলাদেশে ৯০%। ফলে ধমীর্য় বিরোধ এদুটি দেশে নেই। অপর দিকে ৫০ কোটি মুসলমানের বাস চীনে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও নেই। অথচ রযেছে ভারতীয় উপমহাদেশে। তাই ভারতের রাজনীতিতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি মূল নয়, গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হল দক্ষিণ এশিয়ার ৫০ কোটি মুসলমানের বিষয়টিও। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের খুশি করতে যদি ভারতের মুসলিম স্বার্থকে পদদলিত করা হয় তবে তা অশান্ত করবে সমগ্র উপমহাদেশকেও। জাতিয়তাবাদী রাজনীতির সীমানা সীমিত হয় ভাষা ও ভূগোল ভিত্তিক রাজনৈতিক সীমান্ত দিয়ে; অথচ আদর্শ বা ধর্মের রাজনীতিতে সে সীমানা থাকে না। তাই বাংলাদেশের কোন গ্রামে কোন হিন্দুর গৃহ বা মন্দিরে হামলা হলে তা নিয়ে লেখালেখি শুরু হয় ভারতীয় মিডিয়ায়। সেটি রাজনীতির উত্তপ্ত বিষয়ে পরিণত হয় ভারতের প্রতি নগরে। তেমনি ভারতের কোন শহরে বা গ্রামে মুসলিম মারা গেলে প্রতিবাদে মিছিল শুরু হয় লাহোর, করাচী ও ঢাকায়। এটিই স্বাভাবিক, এবং না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। তাই কাশ্মিরের গণহত্যা বা নারী ধর্ষণকে ভারত যতই তার অভ্যন্তরীন বিষয় বলুক না কেন, বিশ্বের মুসলমানেরা সেটি মানতে রাজী নয়। কাশ্মিরে যে জুলুম হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আওয়াজ না তুললে তারা তো চরম গোনাহগার হবে মহান আল্লাহর দরবারে। মুসলমান তো সিন্ধুর হিন্দুদেরকে জুলুম থেকে বাঁচাতে সূদুর ইরাক থেকে ছুটে এসেছিলেন। আজ শুধু কাশ্মিরে নয়, মুসলিম নির্যাতন হচ্ছে সমগ্র ভারত জুড়ে। একমাত্র কাশ্মিরেই গত তিরিশ বছরে নিহত হয়েছে এক লাখের মত মুসলমান। ধর্ষিত হয়েছে হাজার হাজার মুসলিম নারী। যে অজুহাতে ভারত ১৯৭১এ যুদ্ধ শুরু করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, সে অজুহাতে পাকিস্তান যে এখনও ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেনি সেটি তো পাকিস্তানের দূর্বলতার বিষয়। নইলে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ ও সেদেশের ঘরের মধ্যে ঢুকার যে ঐতিহ্য ভারত নির্মাণ করেছে সেটি যে কোন প্রতিবেশী দেশের জন্যও শিক্ষণীয় ও অনুসরণীয় হতে পারে। যে ভারত মুম্বাইয়ে বন্দুকধারীদের হামলার প্রতিবাদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দেয়, সে দেশটি পাকিস্তানের জায়গায় হলে এবং কাশ্মিরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হিন্দু হলে, তারা কি একটি প্রকান্ড যুদ্ধ শুরু করতো না? ভারত যুদ্ধের হুমকী দিয়েছিল ২০০১ সালেও। কারণ, বন্দুকধারীরা তখন হামলা করেছিল ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে।


ভারতের জন্য প্রচন্ড হতাশা, আন্তজার্তিক চাপের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারকে কাহিল করতে পারলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সে দেশের ইসলামপন্থিদের। আগ্রাসী রাশিয়ানদের হাত থেকে আফগানিস্তানকে মূক্ত করতে যে চেতনায় আফগানদের পাশে আরব, পাকিস্তানী, চেচেন, এমন কি বাংলাদেশী ছুটে গিয়েছিল সে অভিন্ন চেতনায় অনেক মুসলমানই যে ভারতে ছুটে যাবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কথা হল, এ চেতনাধারিদেরকে ভারত যতই সন্ত্রাসী বলুক, যারা এমন লড়াইয়ে প্রাণ দেয় তারাও কি সেটি মনে করে? তাদের বিচারে তো প্রতিটি আগ্রাসী যুদ্ধই বড় সন্ত্রাস। আর প্রকৃত যুদ্ধ হল প্রতিরোধ যুদ্ধ। তাই ভারত বা মার্কিনীদের চোখ রাঙ্গানীতে পরিবতর্ন আসছে না জ্বিহাদ বা প্রতিরোধ যুদ্ধের সংজ্ঞায়। একাত্তরে যদি ভারতীয় নাগরিকেরা বাঙালীদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে লড়তে পারে, তবে কোন নীতিটি পাকিস্তানীদের বা অন্যদেশের মুসলমানদের বাধা দিবে ভারতীয় মুসলমানদের সাথে লড়তে?


মুম্বাই-এ সাম্প্রতিক হামলার পর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু না হলে কি হবে, দুইটি দেশের মধ্যে প্রকান্ড যুদ্ধ শুরু হয়েছে মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। হামলার পর পরই ভারতের কয়েক শত টিভি সেন্টার দিবারাত্র প্রচার শুরু করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আক্রমনাত্মক লেখালেখি শুরু হয় ভারতীয় পত্র-পত্রিকায়। তদন্ত শুরুর আগেই দোষী সাব্যস্ত করা হয় পাকিস্তানকে। আর এরূপ প্রচার এবারই প্রথম নয়, যখনই এরূপ হামলা হয়ছে তখনই এরূপ অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এবারের প্রচারে ভারত একা নয়, সাথে নেমেছে পাশ্চাত্যের মিডিয়াও। তারা যেটি প্রচার করেছে তা হল, মুম্বাইয়ের উপর হামলা ভারতের জন্য ১১ই সেপ্টেম্বর। আর হামলাকারিরা এসেছে পাকিস্তান থেকে। পাকিস্তানকে বলছে সন্ত্রাসের লালন ক্ষেত্র। মিডিয়া আক্রমনের শিকার শুধু ধমীর্য় মাদ্রাসা নয়, পাকিস্তানের আর্মি, সরকার এবং জনগণও। কোন কোন ভারতীয় লেখক বলছে, পাকিস্তানের বিনাশ ছাড়া ভারতের শান্তি নেই। তারা পরামর্শ দিচ্ছে দেশটিকে খন্ডিত করার। আফগানিস্তানের উপর যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছিল তেমন একটি প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে ভারতের জন্যও। অনেক ভারতীয় নেতা ও বুদ্ধিজীবী তো পাকিস্তানের উপর হামলা – কমপক্ষে মার্কিন স্টাইলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ধমীর্য় মাদ্রাসার উপর মিজাইল হামলার পরামর্শ দিচ্ছে।


প্রতিটি দেশকে শুধু নিজ-দেশের লোকদের নিয়ে ভাবলে চলে না, প্রতিবেশীর স্বার্থ ও অনুভূতির দিকেও নজর রাখতে হয়। এজন্যই ভারতীয় রাজনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রূপে গণ্য হওয়া উচিত ছিল উপমহাদেশের ৫০ কোটি মুসলমানের অনুভূতির বিষয়টি -যার বিস্তার আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ অবধি। যে কোন সভ্য প্রতিবেশীর ন্যায় সভ্য দেশের বিদেশ নীতিতেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতেবেশীর ঘরে আগুন লাগালে সে আগুন নিজ ঘরেও লাগে। কিন্তু ভারত এ বিষয়টিকে আদৌ গুরুত্ব দেয়নি। তার প্রমাণ, সোভিয়েত রাশিয়া যখন আফগানিস্তান দখল করে ভারত সে আগ্রাসনকে সমর্থণ করে। দেশটিতে রাজনীতির মূল ইস্যু রূপে গুরুত্ব পেয়েছে নিছক নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগণকে খুশি করার বিষয়টিকে। ফলে জনসংখ্যার ১৪% মুসলমান হলে কি হবে, সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা দুই ভাগও নয়। কথা হল, প্রায় ষোল কোটি মুসলমানকে বিক্ষুব্ধ রেখে কি ভারত শান্তি পেতে পারে? বিক্ষুব্ধ জনতার কাতারে যোগ দিযেছে ভারতের খৃষ্টানেরাও। নিযার্তনের শিকার তারাও। উড়িষ্যার কান্দামালে আড়াই মাস ধরে উগ্র হিন্দুবাদীরা বহু খৃষ্টানকে হত্যা করেছে। বহু হাজারকে করেছে গৃহহীন। নিযার্তনের শিকার দলিত হিন্দুরাও।


ভারতকে প্রচন্ড আগ্রাসী ও অহংকারি করেছে তার বৃহৎ ভূগোল, জনসংখ্যা ও সামরিক বাহিনী। অথচ দেখছে না যে, গাজার মাত্র ১৫ লাখ ফিলিস্তিনী ইসরাইলকে চরম অশান্তিতে ফেলেছে। অথচ ইসরাইলের সামরিক শক্তি ভারতের চেয়ে কম নয়। ভারতের ৬ লাখ সৈনিক হিমসীম খাচ্ছে এক কোটি কাশ্মিরীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। অপর দিকে মাত্র ১০ জন বন্দুক ধারি সমগ্র ভারতকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রেখেছিল তিন দিন ধরে। ভারত ভাবছে, তাদের উদ্ধারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে। কিন্তু সেটিও কি সম্ভব? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪০টি ন্যাটো দেশের সৈনিক ইজ্জত হারাতে বসেছে আফগানিস্তানে। কোমর ভেঙ্গে গেছে মার্কিন অথর্নীতির। ইরাকে ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটাতে তিন ট্রিলিয়ন (তিন হাজার বিলিয়ন) ডলারের ঋণের ভার এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ে| কোন নতুন যুদ্ধ লড়ার সামর্থ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্টের নেই। তাই স্ট্রাটেজী নিয়েছে, এ কাজে পাকিস্তানের আর্মিকে কাজে লাগানোর। সে লক্ষ পূরণে প্রচন্ড চাপ দিতে মুম্বাইয়ের ঘটনার পর পর ইসলামাবাদে ছুটে গিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রি কন্ডোলিসা রাইস। নতুন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতিনিধি রূপে গিয়েছিলেন সিনেটর জন কেরি। সে দায়িত্ব পালনে পাকিস্তানের সেকুলার আর্মি দু’পায়ে খাড়া। সীমান্ত প্রদেশে সে কাজ তারা করছিলও। সে কাজে রাজী সেদেশের সেকুলার সরকারও। কিন্তু সমস্য হল, আর্মির হাতে রাজপথের দখল নেই| তাছাড়া একটি মুসলিম দেশের জনগণকে বিক্ষুব্ধ করার জন্য এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, সেদেশের উপর চাপ আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করতে বলে তার মধ্যে কোন মুসলিম দেশের কোন কল্যাণ থাকতে পারে – এটি কি কোন পাকিস্তানী বিশ্বাস করতে পারে? এমন মার্কিন ফরমায়েশের কাছে হামিদ কারজাইযের মত পুতুল সরকারই মাথা নত করতে পারে, কোন স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকার নয়। মার্কিনী কমর্কর্তাদের ঘন ঘন ইসলামাবাদ আগমনে এজন্য বিক্ষুব্ধ জনগণ, আর প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পাচ্ছে লড়াকু ইসলামপন্থিরা। এতে ভারতের বিরুদ্ধে এবং সে সাথে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড একতাবদ্ধ এখন পাকিস্তানী জনগণ। জেগে উঠেছে পাকিস্তানী মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী মহল। তারা বলছে, “ভারত হামলা করতে চাইলে করুক। আমরা প্রস্তুত”। পাকিস্তান ভিয়েতনামের চেয়ে দূবর্ল নয়। ভারতও শক্তিশালী নয় আমেরিকার চেয়ে। তাছাড়া এটি একাত্তর নয় যে দেশটির অর্ধেকের বেশী বাঙালী জনসংখ্যা ভারতের দেওয়া বন্দুক কাধে নিয়ে পাকিস্তানের ধ্বংসে যু্দ্ধ লড়বে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরে এখন আর ঘরের শত্রু নেই। বরং যে তালেবানরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিল তারাও বলছে বন্দুলের নল এখন তারা ভারতের দিকে করতে প্রস্তুত। একাত্তরে পাকিস্তানের হাতে আণবিক বোমা ছিল না, এখন আছে। অপর দিকে ভারতের নিজের আভ্যন্তরীণ বিপদই অনেক। দেশটির ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করে দৈনিক এক ডলারেরও কম আয়ে। তাছাড়া ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র। পাকিস্তানের উপর হামলা করলে সেটি সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের কাছে চিহ্নিত হবে একটি বিশুদ্ধ জ্বিহাদ রূপে। আর জ্বিহাদে মুসলমান নিজ খরচে নিজ-প্রাণ দানের লক্ষ্যে ময়দানে গিয়ে হাজির হয়। তখন সেটি পাকিস্তান এবং ভারতের যুদ্ধ রূপে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এক সময় সোভিয়েত রাশিয়ার ভয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। গড়ে তুলেছিল হাজার হাজার আণবিক বোমা ও বালিস্টিক মিজাইলের ভান্ডার। কিন্তু আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাজিত করার ১০ বছরের প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ বিলিয়ন ডলারও খরচ হয়নি। একজনকেও প্রাণ দিতে হয়নি। কোন আণবিক বোমা বা মিজাইলও ব্যবহার করতে হয়নি। এ বিশাল যুদ্ধের মূল খরচটি বহন করেছে মুসলমানেরা। বিপুল অর্থ ও প্রাণদানকারি মোজাহিদদের আগমণ ঘটেছে মুসলিম দেশ থেকে। তাদের অর্থ ও রক্তদানের ফলেই পরাজিত ও অবশেষে বিলুপ্ত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া। সেরূপ অভিন্ন চেতনা এখন পাকিস্তানের গ্রামে-গঞ্জে। ফলে এতদিন যা হয়নি সেটিই শুরু হয়েছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে ন্যাটোর রশদ বহনকারি শত শত ট্রাক। পেশোয়ার-কাবুল সড়ক অবরোধে লাখো লাখো মানুষ নেমেছে রাস্তায়। রশদ জোগানোর বিকল্প রাস্তা খুঁজতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ধর্না দিচ্ছে মার্কিন বিরোধী রুশ-নেতাদের দরবারে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটিও কি কম অপমানের?


ভারত পাকিস্তানকে বাধ্য করছে সেদেশের লস্করে তায়েবা বা জামাতুদ্দাওয়ার ন্যায় সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করতে। বাধ্য করছে এসব সংগঠনের বহু নেতাকে বন্দী করতে। এ চাপ সৃষ্টিতে ব্যবহার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। অথচ বিশ্বে সবচেয়ে বেশী চরমপন্থি সংগঠনের সংখ্যা ভারতে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আই.বি’র তথ্য মতে ভারতে ২৭০টি চরমপন্থি সংগঠন রয়েছে| ভারত সরকার এসব সংগঠনের নেতাদের গ্রেফতার করা বা সেসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা দূরে থাক তাদের বরং প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেছে। যেমন, বিশ্বের সবচেযে বড় চরমপন্থি সংগঠন হল আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ। এ সংগঠনটির রয়েছে ৪৫ হাজার শাখা এবং ৭০ (সত্তর)লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক। এতদিন সরকারি কমর্চারিদের উপর এ সংগঠনের সদস্য হওয়ার নিষেধাজ্ঞা ছিল। সম্প্রতি গুজরাট সরকার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। দেশটির অতি পরিচিত সন্ত্রাসী হল ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃবৃন্দ। তাদেরই একজন হল নরেন্দ্র মোদী। এখন সে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। এই নরেন্দ্র মোদী যখন ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রি, তখন সেখানে বহু হাজার মুসলমানকে অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। শত শত মুসলিম নর-নারীকে জীবন্ত আগুনে ফেলা হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় মুসলমানদের হাজার হাজার দোকান-পাট ও ঘরবাড়ী। সরকার প্রধান রূপে নরেন্দ্র মোদী সে সন্ত্রাস দমনে ব্যবস্থা না করে মদদ দিয়েছে হিন্দু সন্ত্রাসীদের। পুলিশ বাহিনী সে মুসলিম নিধন প্রকল্পকে থামানোর চেষ্টা করেনি, হত্যাকারিদের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থাও করেনি। বাবু বজরাঙ্গি নামক এক চরমপন্থি নেতা হল নরেন্দ্র মোদীর গুরু। বাবু বজরাঙ্গি যে মুসলিম হত্যায় কতটা উদ্ধত তার কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছেন অরুন্ধতি রায়ঃ “আমরা (গুজরাটের এলাকায়) একটি মুসলিম দোকানকেও ছাড়িনি, আমরা আগুণ জ্বালিয়েছি সবকিছুতেই। আমরা কুপিয়েছি, জ্বালিয়েছি, আগুণ ধরিয়ে দিয়েছি। আমরা তাদেরকে আগুণে পুড়ানোতেই বিশ্বাসী। কারণ এ জারজগুলো তাদের মৃতদেহকে জ্বালাতে চায় না। আমি আমার ফাঁসীকে পরওয়া করি না। ফাঁসীতে ঝুলানোর আগে আমাকে দুটি দিন সময় দাও। আমি জুহাপুরায় ময়দানে কাটাবো যেখানে ৭ থেকে ৮ লাখ এমন মানুষের (মুসলমানের) বাস। আমি তাদের সবাইকে শেষ করে দিব” -(অরুন্ধতি রায়, “Monster in the mirror”, The Guardian, ১৪/১২/০৮) অরুন্ধতি রায় লিখেছেন, বজরাঙ্গির এ কথাগুলো ক্যামেরাবন্দী। কথা হল, ভারত ও তার মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টি করছে লস্করে তাইয়েবা ও জমিয়তুদ্দাওয়াকে নিষিদ্ধ করতে। কিন্তু বজরাঙ্গির ন্যায় এসব নেতাদের মুখে ঠুসি পড়ানোর ব্যাপারে তারা একটি বারও কিছু বলেছে কি?


আজ ভারত জুড়ে হিন্দু জাতীয়তা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের আপোষহীন লড়াইয়ের যে চেতনা, সেটির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে আর.এস.এস নেতা গোলওয়ালকারের কথায়। গোলওয়ালকার ১৯৪৪ সালে আর.এস.এস এর প্রধান হন। তিনি বলেছেন, “সেই অশুভ দিনটি থেকেই, যখন মুসলমানদের আগমন ঘটে ভারতে, আজ অবধি হিন্দুস্থান তথা হিন্দু জাতি বীরদর্পে লড়ে যাচ্ছে। বর্ণবাদী চেতনা এখন জেগে উঠছে। নিজেদের জাতি ও জাতীয় সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য জার্মান জাতি বিশ্বকে একটি ঝাকুনি দিয়েছে দেশকে ইহুদী-মূক্ত করার মধ্য দিয়ে। এভাবে সবোর্চ্চ প্রকাশ ঘটেছে জাতীয় অহংকারের। আমাদের হিন্দুস্থানে আমাদের জন্য এটি শিক্ষণীয়, যা থেকে আমাদের লাভ উঠাতে হবে। -(অরুন্ধতি রায়, “Monster in the mirror”, The Guardian, ১৪/১২/০৮)


আজ যে সংকটের মুখে ভারত সেটির কারণ অনেক। তবে মূল কারণটি তাদের কাশ্মির নীতি। সেখানে অবিচার ও অত্যাচার ঘটছে অতি প্রকটভাবে এবং সেটি বিগত ৬০ বছর যাবত। সেখানে মোতায়েনকৃত ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্য ইতিমধ্যে এক লাখেরও বেশী কাশ্মিরীকে হত্যা করেছে। ধর্ষণ করেছে বহু হাজার কাশ্মিরী মহিলাদের। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ সেখানে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ। উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি আরেক ফিলিস্তিন। কোন বিবেকমান মানুষ কি তাতে নীরব থাকতে পারে? অথচ ভারতের রাজনীতি, মিডিয়া ও প্রশাসনে বিবেকবান মানুষের সংখ্যা যে কত কম সেটি বুঝা যায় তাদের এ অব্যাহত কাশ্মির নীতি দেখে। তারা এতটাই নীরব যে, সেখানে যেন কিছুই ঘটেনি। এমন একটি প্রকান্ড অবিচার কি কোন দেশকেই শান্তি দেয়? বরং এমন প্রতিটি অবিচার থেকেই জন্ম নেয় প্রকান্ড যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও অশান্তি। ভারতে আজ সেটিই হচ্ছে। ১৯৪৮ সালে গায়ের জোরে কাশ্মির দখল করে ভারত ভেবেছিল, কাশ্মির সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। জবর দখলের পর পরই জোরগলায় বলা শুরু করে, কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালেই বলেছিল, সেখানে গণভোট হতে হবে। জবাবে ভারত বলে, কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় সেখানে গণভোটের প্রশ্নই আসে না। কথা হল, অবিচ্ছেদ্য অংগ তো পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধুও ছিল। তবে তারা কেন ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হল এবং পাকিস্তানে যোগ দিল? সেটি তো্ তাদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণেই। অথচ ভারত সে যুক্তি মানতে রাজী নয়। এটি ভারতের এক উদ্ধত মাস্তানী। কোন ব্যক্তি যখন আত্মহত্যায় পা বাড়ায় তখন তার মধ্যে হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। সে কল্যাণ দেখে বিষপানের মধ্যেও। তেমনি ঘটে একটি জাতির বেলায়ও। ভারতও তাই কল্যাণ খুঁজছে কাশ্মিরে অব্যাহত যুদ্ধের মাঝে। অথচ আরো শত বছরও যদি ভারতীয় বাহিনী দখলদারি বজায় রাখে তবুও কি কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে? বরং এতে বাড়বে অশান্তি, বাড়বে শুধু ভারত জুড়ে নয়, সমগ্র উপমহাদেশ জুড়েও। এতে বাড়ছে জ্বিহাদের চর্চা। এভাবে জ্বিহাদ প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে একটি ইসলামের ইনস্টিটিউশন রূপে। ফ্রান্সের আলজেরিয়া দখল, সোভিয়েত রাশিয়ার আফগানিস্তান দখল এবং ইসরাইলের ফিলিস্তিন ও লেবানন দখলে সেসব এলাকায় তেমনি ইনস্টিটিউশন রূপে গড়ে উঠেছিল জ্বিহাদ। জ্বিহাদের সে ইনস্টিটিউশনগুলো থেকে লক্ষ লক্ষ লড়াকু মোজাহিদ সৃষ্টি হযেছে। আর আজ কাশ্মিরে সেটিই হচ্ছে ভারতীয় দখলদারির কারণে। এর ফলে গুণগত পরিবর্তন আসতে বাধ্য উপমহাদেশের রাজনীতিতে। এসব মোজাহিদ হাত থেকে পরাজয় এড়াতে পারেনি ফ্রান্স ও সোভিয়েত রাশিয়া। যদিও উভয় দেশই ছিল আণবিক শক্তিধারি। পরাজয় এড়াতে পারছে না ইসরাইলও। একই কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনীর বিজয় অসম্ভব হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানে। কথা হল, ভারত কি সেই একই পরিণতির দিকে এগুচ্ছে না? ২০/১২/০৮
Comments (1)
1 Thursday, 12 March 2009 21:57
Md. ZIaul Hoque

Assalamu alaikum brother, I have found your website today from a group in facebook about BDR mutiny. I am blessed to find your website.

This article is so well balanced in spreading the truth and only truth and so rarely seen. You are just spreading the words of a honest mind who believes in islam and knows what Islam is all about. Islam is all about truth. Jazakallah khairun brother.

ps: I would love to see whats your take on the recent BDR mutiny. Waiting to see your next articles. - Zia



Bookmark this,
 
Banner