Bookmark and Share
Home ইসলাম যে বিদ্রোহ মুসলিম বিশ্বজুড়ে

eBook Collection

সর্বাধিক পঠিত

যে বিদ্রোহ মুসলিম বিশ্বজুড়ে Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 25 April 2009 00:24
প্রবল বিদ্রোহ চলছে আজ সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। তবে এ বিদ্রোহ কোন দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকের বিরুদ্ধে নয়। বরং দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকগণ তো নির্বিঘ্নে বসে আছে জনগণের সমর্থন নিয়েই। তাদের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ নেই, তেমনি আন্দোলনও নেই। মুসলিম দেশগুলিতে তেমন বিদ্রোহ নেই বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধেও। বরং বহু দেশের মুসলমানতো আগ্রাসী কাফেরদের নিজ দেশে হামলায় আহবানও করছে। অধিকৃত হওয়ার পর আগ্রাসী শত্রুকে অধিকার দিচ্ছে বিশাল বিশাল ঘাঁটি নির্মাণের। আফগানিস্তান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান জুড়ে যে বিশাল বিশাল মার্কিন ঘাটি নির্মিত হয়েছে সেটি তো সেসব দেশের মুসলিম শাসকদের অনুমতি নিয়েই। অপরদিকে কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে বহু মুসলিম দেশের বহু লক্ষ মুসলমান নেমেছে মুসলিম নিধনে। সেটি ১৯১৭ সালে আরব দেশে যেমন হয়েছিল, তেমনি ১৯৭১এ বাংলাদেশেও হয়েছে। এবং আজ হচ্ছে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন ও চেচনিয়ায়।

দেশে দেশে মুসলমানদের আজকের বিদ্রোহ কোন শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে নয়। বরং শয়তানী শক্তির সাথে তাদের সহযোগিতা এতটাই গভীর যে সে সহযোগিতার পথ বেয়ে আল্লাহর আইন খোদ মুসলিম দেশগুলিতে আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়েছে। ফলে আদালত, ব্যাংক-বীমাসহ সর্বত্র যে আইন আধিপত্য বিস্তার করে আছে তা কাফেরদের আইন। এককালে এ কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা করতে বিপুল রক্ত, অর্থ, শ্রম ও মেধা ব্যয়ে কাফেরদের মুসলিম দেশে তাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে, মুসলিম নিজ-দখলে নিতে হয়েছে। লাগাতর যুদ্ধও লড়তে হয়েছে। তারা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজও কাফেরদের সে আইন, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি বিজয়ের বেশে প্রতিষ্ঠিত আছে। এবং আজ সেটি অব্যাহত প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে মুসলমানদের নিজস্ব শ্রম, মেধা, অর্থ ও রক্তের বিণিময়ে। ফলে মুসলিম দেশের আইনে জায়েজ রূপে গণ্য হচ্ছে মদ্যপান, সূদ খাওয়া ও সূদ দেওয়া এমনকি ব্যাভিচারও। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ নেমেছে এরূপ হারাম ব্যবসায়। এভাবে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি নিজেই পরিণত হয়েছে শয়তানি শক্তির শক্তিশালী হাতিয়ারে। এভাবে মুসলিম দেশে মুসলমানদের বিদ্রোহ চলছে খোদ আল্লাহ ও তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ চলছে রাসূল্লাহ (সাঃ)র সূন্নতের বিরুদ্ধেও। আর এই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)র প্রতি আজকের মুসলমানদের আনুগত্যের নমুনা। লক্ষ্যণীয় হলো, এমন প্রচন্ড বিদ্রোহের মাঝেও বহু লক্ষ মসজিদ থেকে আযান ধ্বণিত হয়। কোটি কোটি মানুষ নামায-রোযা-হজ-যাকাতও পালন করে। যেন রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহীরা রাজার নামে জিন্দাবাদ ধ্বণি তুলছে। তাদের কথা, রাজার পাওনা শুধু্ এটুকুই। রাজার হুকুমের আনুগত্য যেমন নয়, তার সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়াও নয়।


অথচ মহান আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবীতে মানুষের সামনে বেশী পথ খোলা রাখেননি। পথ মাত্র দুটিঃ একটি পরিপূর্ণ আনুগত্যের, অপরটি বিদ্রোহের। মাঝামাঝি তৃতীয় পথ নেই। মধ্যপথ বা নরম-পন্থা বলেও কিছু নেই। পরিপূর্ণ আনুগত্যের পথ যারা বেছে নেয় একমাত্র তাদেরকেই মুসলমান বলা হয়। আর বিদ্রোহের পথ হলো কাফেরের। আনুগত্যে অপূর্ণতা বা আন্তরিকতার কমতি দেখা দিলে সেটিকে বলা হয় মুনাফেকি। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সেনা-হুকুম অমান্য করার হক থাকে না। এখানে অবাধ্যতা গণ্য হয় বিদ্রোহ রূপে। সে বিদ্রোহে সৈনিক শুধু চাকুরিই হারায় না, গুরুদন্ডও পায়। তেমনি অবস্থা মুসলমানদেরও। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারনে মুসলমানরা খেলাফতের চাকুরি হারিয়েছে অনেক আগেই, এখন পাচ্ছে গুরুদন্ড। তারা বিশ্বশক্তির মর্যাদা হারিয়ে এখন ভিক্ষার ঝুলি ও করুণার পাত্র রূপে গণ্য হচ্ছে কাফেরদের দরবারে। নিজ দেশে প্রতিনিধি সেজেছে শয়তানের। ফলে তাদের হাতে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ভাবে বেড়েছে সূদী ব্যংক এবং ঘরে ঘরে ঢুকেছে সূদ। অথচ ইসলামে এ পাপকর্মটি নিজ মায়ের সাথে ব্যাভিচারের চেয়েও জঘন্য বলা হয়েছে। লক্ষ্যণীয় হলো, মুসলিম দেশের কোটি কোটি মানুষ সূদী লেনদেনের নামে এমন জঘন্য ব্যাভিচারে লিপ্ত হলেও তা নিয়ে কোটি কোটি মুসল্লীর ও রোযাদারের মাঝে কারো কি কোন ক্ষোভ আছে? কারো মুখে কোন প্রতিবাদ আছে? বেতনে হাত পড়লে বা দ্রব্যমূল্য কমানো নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল নামে। অথচ এমন জঘন্য পাপ বন্ধের লক্ষে কোন প্রতিবাদ নেই, আন্দোলনও নেই। বরং তাদের চোখের সামনে মুসলিম নগরীর অলি-গলিতে বেড়ে চলেছে পতিতা পল্লি, বাড়ছে ঘুষ, বাড়ছে সন্ত্রাস ও খুণ। দুর্বৃত্তিতে তারা কাফেরদের থেকেও বার বার শিরোপা ছিনিয়ে নিচ্ছে।


অথচ কোরআনে মুসলমানদের বলা হয়েছে শ্রেষ্ঠ মানুষ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবেঃ “যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তারাই এ ভূ-পৃষ্ঠে শ্রেষ্ঠ।”-(সুরা বাইয়েনাহ, আয়াত ৭) অর্থাৎ কোন ব্যক্তি ঈমান আনলো এবং নেক আমলও করলো অথচ শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হলো না, তখন বুঝতে হবে তার ঈমান আনা ও আমলে অপূর্ণতা বা ভন্ডামী আছে। কারণ আল্লাহর ঘোষণা তো মিথ্যা হতে পারে না। নাউযু বিল্লাহ মিন যালিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা যে কতটা নির্ভূল সেটির প্রমাণ মেলে সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে। তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ পরিণত হয়ে কোরআনের এ আয়াতকে তারা প্রমানিত করেছিলেন। এবং সেটি ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের মধ্য দিয়ে। শ্রেষ্ঠতর মানুষ ও পূর্ণতর ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার এটিই একমাত্র প্রেসক্রিপশন। তবে প্রেসক্রিপশনের ঔষধ আংশিক খেলে রোগ সারে না, তাতে শরীরে সুস্থ্যতাও আসে না। ঈমানদারির ক্ষেত্রেও তেমনি ফাঁকিবাজী চলে না। পূর্ণতা অর্জন করতে হয় ঈমানে, এবং সেটির শুরু হয় ইসলামে পরিপূর্ণ প্রবেশের মধ্য দিয়ে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশটি হলোঃ “উদখুল ফিস সিলমে কা’ফ্ফা।” অর্থঃ “পরিপূর্ণ রূপে প্রবেশ করো ইসলামে।” ইসলাম হলো সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর একমাত্র প্রেসক্রিপশন। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ্যতা আসে আল্লাহর এ প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ অনুসরণের মধ্য দিয়ে। মুসলমান হওযার অর্থই হলো, এ প্রেসক্রিপশনের প্রতিটি নির্দেশকে মেনে চলা। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্টের কোন অঙ্গকে আল্লাহর নির্দেশের বাইরে রেখে আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হওয়ার সুযোগ নেই। এ পথ অবাধ্যতা বা বিদ্রোহের। এমন অবাধ্যতার মাঝে সুযোগ নেই পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়ার। এ কাজ একমাত্র শয়তানের। শয়তানের সে বৈশিষ্ঠটি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবেঃ “এবং যখন সকল ফেরেশতাদেরকে বললাম আদমকে সিজদা করো তখন সবাই সিজদা করলো, একমাত্র ইবলিস ছাড়া। সে অবাধ্য হলো, নিজেকে বড় ভাবলো এবং শামিল হলো কাফেরদের মধ্যে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ৩৪) অবাধ্যতা যে আল্লাহর কাছে কতটা অপছন্দের এবং সে অবাধ্যতা কীরূপে ব্যক্তিকে অহংকারি ও কাফেরে পরিণত করে সেটিরই বর্ণনা দিয়েছেন মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা নিজে। ইবলিসের অপরাধটি এ ছিল না যে, সে মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করতো। তার অপরাধ ছিল, আল্লাহর একটি মাত্র হুকুমকে সে অমান্য করেছিল। একই ভাবে আল্লাহর আযাব নেমে এসেছিল বনি ইসরাইলের উপর। বনি ইসরাইলের লোকেরা যে আল্লাহকে অস্বীকার করতো তা নয়। তারা তো বরং নিজেদেরকে তারা আল্লাহর নির্বাচিত জাতি রূপে মনে করতো। তাদের অপরাধ, তারাও ইবলিসের ন্যায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে। তাদেরকে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছিলেন কানানের অধিকৃত ভূমিকে সেখানে অধিকার জমানো জালেমের হাত থেকে মুক্ত করতে। কিন্তু তার সে হুকম অমান্য করে হযরত মূসা (সাঃ)কে বলেছিল, “হে মূসা তুমি ও তোমার আল্লাহর গিয়ে যুদ্ধ করো। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” কথা হলো, ইবলিস ও বনি ইসরাইলের ন্যায় একই রূপ পথ অবাধ্যতা বা বিদ্রোহের পথ কি বেছে নেয়নি কি আজকের মুসলমানেরা? তবে মুসলমানদের অপরাধ এক্ষেত্রে আরো গুরুতর। ইহুদীরা জালেম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলেও জালেমের বাহিনীতে যোগ দেয়নি। অথচ মুসলমানেরা আজ নিজদেশে জালেম বাহিনীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনছে, তাদের সাথে কাঁধ কাঁধ মিলিয়ে মুসলিম নিধনে অংশও নিচ্ছে। মুসলমানদের এমন আচরনের কারণেই কোন মুসলিম দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ভারতসহ কোন কাফের দেশের পক্ষেই কোন মুসলিম দেশে সহযোদ্ধা পেতে কোন অসুবিধা হয়নি।


আল্লাহর পথে জিহাদের হুকুম শুধু বনি ইসরাইলের উপর আসেনি। এসেছে সর্বকালের ঈমানদারদের উপর। আজকের মুসলমানদের তাই এ হুকুমের আনুগত্য থেকে পালাবার রাস্তা নেই। আল্লাহতায়ালা চান ইসলামের প্রতিষ্ঠা। চান তার সার্বভৌমত্বের বিজয়। অধিকৃত ভূমি শুধু কানানের ভূমিই ছিল না। এ ধরাপৃষ্ঠের অধিকাংশ ভূমিই আজ অধিকৃত, এবং তা কাফের তথা শয়তানি শক্তির হাতে । আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বদলে দখল জমিয়েছে শয়তানি শক্তি। মহান আল্লাহতায়ালা চান, এসব কুফরি শক্তির হাত থেকে তার নিজ ভূমির মুক্তি। এবং সেটি মুসলমানদের হাত দিয়ে। অথচ একাজ তিনি নিজে তার ফেরেশতাদের দ্বারা নিমিষেই করতে পারতেন। গাছের একটা ঝড়া পাতা ফেলার চেয়ে একাজটি মহান আল্লাহর কাছে সামান্যতম কঠিনও ছিল না। কিন্তু সেরূপ বিজয়ে পরীক্ষা হত না বান্দাহর। অথচ মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে পরীক্ষার নেওয়ার জন্য। এবং এ দুনিয়াটি পরীক্ষাকেন্দ্র বৈ নয়। তাই এজন্য অনিবার্য করা হয়েছে জিহাদকে। কোরআনে বলা হয়েছেঃ “তোমরা কি ধারণা করে নিয়েছো যে এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ সে অবস্থা তোমাদের উপর এখনও আসেনি যা তোমোদের পূর্ববর্তীদের উপর এসেছিল। তাদের উপর এসেছে এমন ভয়ানক বিপদ, কষ্ট, কাঁপুনি যাতে তাদের নবী এবং তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে একথাও বলতে হয়েছে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? তোমরা শোনে নাও আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪) তাই জিহাদের হুকুম শুধু বনি ইসরাইল বা নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের উপর নয়, জিহাদের হুকুম হলো সর্বকালের ও সর্বস্থানের মানুষের উপর। যারাই এ জীবনে প্রমোশন চায় এবং ওপারে জান্নাত চায়, -এ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ তাদের সবার জন্যই অনিবার্য। এটি পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশের শর্ত এ নয় যে তাকে লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করতে হবে। বরং শর্ত হলো সর্বশক্তি ও নিষ্ঠার আত্মনিয়োগ। সফলতা তো আসে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। বান্দাহর পাওনাটুকু নির্নীত হয় তার আত্মনিয়োগের মাত্রা থেকে। কোরআনে সে আত্মনিয়োগের ঘোষণাটি এসেছে এভাবেঃ “তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জেহাদ কর আল্লাহর পথ নিজেদের মাল ও জান দিয়ে, এটি তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পার।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৪১) এটি মহান আল্লাহর হুকুম। যারা এ হুকুমের অবাধ্যতা করবে, তাদেরকে তার পরিনতিও জানিয়ে দেওয়া হযেছে। বলা হযেছেঃ “যদি বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তদ আযাব দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তার কোনে ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৩৯) উপরুক্ত আয়াতটি অনুযায়ী জিহাদ না করার শাস্তি মূলতঃ দুটি। এক. আল্লাহর আযাব যা পরকালে অনিবায। তবে সেটি দুনিয়াতেও আসতে পারে। তবে দুনিয়াতে যেটি অনিবার্য সেটি হলো অন্যজাতির গোলামী। তাই মুসলিম সমাজে যখনই জিহাদে অনাগ্রহ বেড়েছে তখনই তাদের মাথার উপর পাশ্চাত্যের আধিপত্যবাদী শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।এ শাস্তি থেকে মুক্তি মেলে জিহাদে অংশ গ্রহনের মধ্য দিয়েই।


ঈমানদারের কাজ হলো, মহান আল্লাহর কোরআনহুকুমগুলোকে তালাশ করা। যেখানে হুকুম, সেখানেই সেহুকুমের আমলে লেগে যাওয়া। এখানে বিদ্রোহ হলে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। তখন ঘনিয়ে আসে পরাজয়। বিজয়ের লক্ষ্যে মহান আল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ হুকুম হলোঃ “এবং তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। এবং পরস্পরে বিছিন্ন হয়োনা।” –আল ইমরান। অনৈক্য হলো আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আলামত। মুসলিম উম্মাহর অনৈক্য ও বিভক্ত মানচিত্র দেখে অন্ততঃ এটুকু নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, এ সমাজে তেমন আগ্রহ নেই আল্লাহর হুকুম পালনে। বরং আগ্রহ বেড়েছে আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায়। ফলে একতার বদলে প্রতিদিন বাড়ছে অনৈক্য, এক দেশ ভেঙ্গে গজিয়ে উঠছে নতুন দেশ ও বাড়ছে নতুন পতাকা। আর এভাবেই নিঃশেষ হচ্ছে উম্মাহর শক্তি। এবং মুসলমানদের রাজনীতির মূল মন্ত্রে পরিনত হয়েছে, মুসলিম বিশ্বের বিভক্ত এ মানচিত্রকে স্থায়ী রূপ দেওয়া। আল্লাহ হুকুমের বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিদ্রোহ চলছে মুসলিম নামধারি মহিলাদের পক্ষ থেকেও। সেটি ঘটছে ইসলামের পর্দা বা হিজাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। বেপর্দা হলো আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। আর মুসলিম দেশে সে বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়ছে লাখে লাখ। আল্লাহর অবাধ্যতায় এরা যে কতটা উগ্র সেটি এভাবেই তারা জাহির করছে। বাংলাদেশের মত দেশে বিদ্রোহের সে ঝান্ডা নিয়ে রাজনীতিতে নামছে মুসলিম নামধারি মহিলারা। মাঝে মধ্যে উমরাহ করে তারা ধোকা দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এমনকি বহু নামাযী ও রোযাদার নাগরিক এসব বিদ্রোহীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করছে। তাদেরকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনেও বসাচ্ছে। এভাবে মুসলিম দেশের সর্বোচ্চ পদটি দখলে নিয়েছে আল্লাহর অবাধ্য বিদ্রোহীরা। যে পদে বসেছিলেন হযরত আবুবকর (রাঃ), হযরত ওমর(রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ)ও হযরত আলী (রাঃ)র ন্যায় মহান ব্যক্তিরা, আজ সেখানে বসেছে আল্লাহর দ্বীনের চরম অবাধ্যরা। আজকের মুসলমানদের ব্যর্থতার বড় কারণ তো এখানেই। দেশের ড্রাইভেট সিটে এসব বিদ্রোহীদের বসিয়ে অনেকে তসবিহ হাতে পিছনের বগীতে আল্লাহভক্ত সেজেছে। এক্ষেত্রে আরো লক্ষ্যণীয় হলো বাংলাদেশের মত দেশে ইসলামপন্থিদের আচরণ। আল্লাহর দ্বীনের এমন অবাধ্য নেত্রীদের রাজনীতির ময়দানে ইমাম মেনে চলছে তথাকথিত ইসলামপন্থিরা। দাড়ীটুপি মাথায় দিয়ে তারা সারি বাঁধছে এসব মহিলাদের পিছে। কথা হলো এটিই কি ঈমানদারি? এপথে বাড়ে কি ইসলামের গৌরব? আসে কি ইসলামের বিজয়? এপথে নির্বাচনী বিজয় তো একাধিক বার এসেছে, কিন্তু ইসলামের বিজয় কি একটুও বেড়েছে? আল্লাহর দ্বীনের এমন উদ্ধত বিদ্রোহীদের সাথে মিত্রতা গড়ে কি আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? এরূপ কোয়ালিশন করে নির্বাচনি বিজয় সম্ভব হলেও তাতে মুসলমানের কি লাভ? দ্বীনের কি কল্যাণ? আল্লাহতায়ালা দেখতে চান তার নিয়ত ও সাচ্চা ঈমানদারি, বিজয় নয়। বিজয় তো মহান আল্লাহর দান। কিন্তু যারা নিজের সাড়ে তিন হাত দেহের উপর বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়ে বেড়ায় তাদের সাথে মিত্রতা গড়লে কি আল্লাহতায়ালা খুশি হন?


কোন জাতির ব্যর্থতা নিছক সরকারের কারণে আসে না। আসে জনগণের ব্যর্থতার কারণেও। বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা তখন আর শুধু কোন বিশেষ পেশা বা শ্রেণীর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটি ছড়িয়ে পড়ে আম-জনতার মাঝে। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা তখন জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়। এ ব্যর্থতার জন্য আল্লাহতায়ালার দরবারে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় শুধু সরকারকে নয়, সমগ্র জাতিকেও। জাতির অর্জিত সফলতার কৃতিত্ব যেমন জনগণের, তেমনি ব্যর্থতার দায়ভারও। তাই আদ-সামুদকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে শুধু নেতাদের ব্যর্থতা বা অবাধ্যতার কারণে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অযোগ্যতা বা ব্যর্থতার কারণে। একারণে শুধু ফিরাউনকে ডুবিয়ে মারা হয়নি, মারা হয়েছে তার বাহিনীর লোকদেরও। তেমনি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে আযাব বা বিপর্যয় নেমে আসে শুধু নেতাদের জীবনেই নয়, দুর্ভিক্ষ, ঘূর্ণিঝড়, প্নাবন বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারাতে হয় সে জাতির লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকেও। অন্যধর্মের অনুসারিদের থেকে মুসলমানদের বড় পার্থক্য শুধু এ নয়, মুসলমানেরা নিয়মিত নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালন করে এবং তাদের নাম ও পোষাক-পরিচ্ছদও অন্যদের থেকে ভিন্ন। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারে অংশ নেওয়া অন্যধর্ম যেখানে গুরুত্ব দেয়নি বা ইবাদত রূপে গণ্য করেনি, ইসলাম সেটিকে শুধু ইবাদতই নয়, বাধ্যতামূলক করেছে। ইসলামে এটি জিহাদ। অন্য ধর্ম রাজনীতি থেকে মানুষকে দূরে টানে। অথচ ইসলাম তাদেরকে টানে রাজনীতিতে। শুধু ভোট দিতে নয়, জানমাল দিতেও অনুপ্রাণীত করে। ইসলামে এটি জিহাদ। এ জিহাদ থেকে দূরে থাকাটি ইসলামে মহাপাপ। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তাই শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালনে অবাধ্যতা নয়, বরং এ জিহাদ থেকে দূরে থাকাটিও। অথচ মুসলিম বিশ্বজুড়ে জনগণের কাতারে ব্যাপক বিদ্রোহ চলছে মূলতঃ এ ক্ষেত্রটিতে। এমন বিদ্রোহে অসম্ভব হয় ব্যক্তির মুসলমান থাকা। মুসলিম রাষ্ট্রে যখন এমন চেতনার মানুষ বিজয়ী হয় তখন বিলুপ্ত হয় কাফের রাষ্ট্র থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের পার্থক্য। ভারত থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন-আদালত, ব্যাংক-বীমার পার্থক্য তাই চোখে পড়ার মত নয়। অথচ ইতিহাসের অতি সত্য বিষয় হলো, নবীজী (সাঃ)র যুগে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী অর্থ, সময়, মেধা ও রক্তের ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে। ইসলামের শুরু থেকেই দেশগড়ার এ মহান দায়িত্ব নিছক রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের কাজ রূপে গণ্য হয়নি। বরং এ দায়িত্ব সবার। এমহান ব্রত কোন খেলার বিষয় নয় যে মুষ্টিমেয় খেলোয়াড় খেলবে এবং আম-জনতা নীরব দর্শকরূপে দেখবে। বরং এখানে বিণিয়োগ ঘটবে সবার প্রতিভা ও সামর্থের। দেশগড়ার দায়িত্ব সবার। মুসলমান মাত্রই তখন রাজনীতির মধ্য মাঠে নেমে আসে। কোন কাফের বা মোনাফেকের জন্য রাষ্ট্র বা সমাজের কোন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রই তখন খালী রাখা হয় না।


মুসলিম উম্মাহর পরাজয়ের কারণ অনেক। তবে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, দেশগড়া ও দেশের প্রতিরক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি সীমাবদ্ধ হয় মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে এবং দর্শকে পরিণত হয় সংখ্যাগরিষ্ট আমজনতা। তখণ সকল বিফলতার জন্য দায়বদ্ধ করা হয় সেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের। অথচ সফলতার ন্যায় বিফলতার জিম্মাদারিও সবার। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা যখন অস্তমিত হলো তখন শুধু সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় হয়নি। পরাজিত হয়েছিল বাংলার সমগ্র মানুষ। এ পরাজয়ের জন্য শুধু মীর জাফরকে দায়ী করে কেবল অসুস্থ্য চেতনার মানুষই নিজ দায়ভার কমাতে পারে, সেটি বিবেকবান মানুষ পারে না। সে পরাজয়ের জন্য দায়ী ছিল বাংলার সমগ্র মানুষ। নিজ ঘরে আগুন লাগলে সে আগুন থামানোর দায়িত্ব গৃহে বসবাসকারী সবার। ঘর জ্বলতে দেখেও সে পরিবারের কেউ নীরব ও নিষ্ক্রীয় থাকলে তাকে কি আদৌ সুস্থ্য বলা যায়? খন্দরে যুদ্ধে আরবের কাফেরদের সম্মিলিত হামলায় মদিনা নগরী যখন অবরুদ্ধ, তখন প্রতিটি পুরুষই শুধু নয়, প্রতিটি নারীও মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শত্রুর সে হামলার মুখে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা শতভাগ। ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি থেকে তারা রক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক বৃটিশ হামলার মুখে সবাই দূরে থাক, প্রতিহাজারে একজনও কি ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিল? হয়নি। ফলে এমন জাতির স্বাধীনতা রক্ষা পায় কি করে? পরাজয় ও পরাধীনতার গ্লানীই কি এমন জাতির ন্যায্য পাওনা নয়? প্রতিরক্ষার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমাদের পূর্ব-পুরুষরা সেদিন মুষ্টিমেয় রাজকর্মচারি ও ষড়যন্ত্রকারীর খেলায় পরিণত করেছিলেন। নিজেরা ব্যস্ত থেকেছেন চাষাবাদ ও পশুপালনে। নবীজীর আমলে কিছু অন্ধ ও পঙ্গু সাহাবা ছাড়া কেউ কি এমন জিহাদ থেকে কোন সময় দূরে থেকেছেন? অথচ আজ ক`‌জন মুসলমান জীবনে একটি মাত্র দিন একাজে বিণিয়োগ করছে? মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষার যে কোন যুদ্ধ বা প্রয়াসই হলো জিহাদ। একাজে অংশ নেওয়ার পুরস্কার অপরিসীম। হযরত সাহল বিন সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণীত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “এক দিনের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা পাহারা দেওয়ার পুরস্কার সমগ্র পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার চেয়েও অধিক। জান্নাতে ঘোড়ার চাবুকের সমপরিমান জায়গার মূল্য সমগ্র পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যা কিছূ আছে তার চেয়েও অধিক। আল্লাহর রাস্তায় সকালে বা সন্ধায় লড়াইয়ের পুরস্কার সমগ্র পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যা কিছূ আছে তার চেয়েও অধিক।” -সহীহ আল বোখারী ও সহীহ আল মুসলিম। অথচ মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষার সে যুদ্ধকে সংগঠিত করতে ১৭৫৭ সালে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। আজও কি তারা কোথাও সফল হচ্ছে? মুসলিম দেশগুলি তো দখলে গেছে আল্লাহ ও তার দ্বীনের বিপক্ষ শক্তির হাতে। তাদের অধিকাংশের জন্ম মুসলিম দেশে হলেও তাদের অবস্থান ইসলামের পক্ষে নয়। শরিয়তের বিধানকে এরা বলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে, নির্বাচন করে এবং আন্দোলনেও নামে। অথচ অধিকাংশ মুসলিম দেশের জনগণ ইসলামের এ বিপক্ষ শক্তির দখলদারিত্বকে যে নীরবে মেনে নিয়েছে তা নয়, সহযোগিতাও করছে। এমন জনগণ আল্লাহতায়ালার দরবারে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াবে না বা আযাবে পড়বে না তা কি হতে পারে?


বাংলা বিজয়ের প্রায় শত বছর পর একই আগ্রাসী বৃটিশ বাহিনী আফগানিস্তানে ঢুকেছিল। তাদের প্রতিহত করতে আফগান জনতা হাতের কাছে যা পেয়েছিল তা নিয়েই ময়দানে নেমেছিল। সে লড়াকু সৈনিকদের মাঝে কে সরকারি আর বেসরকারি -সে ভেদাভেদ সেদিন ছিলনা। ফলে আফিগানিস্তান দখল করা দূরে থাক, বৃটিশ বাহিনীর বেশীর ভাগ সৈন্যই সেদিন প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি। তাদের সে লোমহর্ষক পরাজয়ের কথা বৃটিশ জাতি আজও ভুলতে পারেনি। অথচ সিরাজুদ্দৌলার আমলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার যে লোকবল, অর্থবল ও সামরিক বল ছিল তা আফগানিস্তানের ছিল না। যা ছিল তা ছিল সে তুলনায় অনেক কম। তবে যেটি ছিল তা হলো জিহাদের সাথে আম-জনতার গভীর সম্পৃক্ততা। কাফের শক্তির হামলার মুখে প্রতিরক্ষার দায়ভার নিছক সরকারের উপর তারা ছেড়ে দেয়নি। বনি ইসরাইলের ন্যায় এটিও ভাবেনি, বিজয় এনে দিবে মহান আল্লাহর কোন রাসূল এবং তাঁর কোন খাস বাহিনী। কখনও একথা ভাবেনি, তাদের দায়িত্ব কেবল বসে বসে কে হারে কে জিতে সেটি দেখা, -যেমন ১৭৫৭ সালে বাংলার মানুষ দেখেছিল। বরং কাফের শক্তির হামলার প্রতিরোধকে তারা পবিত্র জিহাদ গন্য করেছিল। সর্বশক্তি দিয়ে তাতে আত্মনিয়োগও করেছিল। এভাবে আল্লাহর হুকুম পালন করেছে জান-মাল দিয়ে। একই ভাবে তারা পরাজিত করেছিল বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াকে। যুগে যুগে মুসলমানদের বিজয় ও গৌরব বেড়েছে তো এ পথেই। মিশর, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশের সেনাবাহিনী যেখানে পরাজয় ছাড়া নিজ নিজ দেশের জন্য আজ অবধি কোন বিজয় আনতে পারেনি, সেখানে দরিদ্র আফগানরা বাড়াচ্ছে শুধু নিজেদের বিজয় নয়, মুসলিম উম্মাহরও। পঞ্চাশটির বেশী মুসলিম সরকারের মধ্যে একমাত্র তালেবান সরকারই আল্লাহর শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী না হয়ে সেটির প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছে। শরিয়ত-বিরোধী শক্তির মোকাবেলায় বিশাল কোরবানীও পেশ করেছে। ফলে এ যুগে আল্লাহর কাছে তাদের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কারা হতে পারে? বিশ্বের তাবত শয়তানী শক্তি এজন্যই তাদের বিরুদ্ধে এতটা ক্ষিপ্ত। তাদের ঘরবাড়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষেত-খামারের উপর ফেলেছে হাজার হাজার টন বোমা। হত্যা করেছে হাজার হাজার নিরপরাধ নারী-শিশু। এবং এরাই মুসলিম বিশ্বের সবগুলো দৃর্বৃত্ত রাজাবাদশাহ ও সরকারকে যে তারা শুধু সমর্থণ দিচ্ছে তা নয়, অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও মেধা দিয়ে পরিচর্যা এবং প্রতিরক্ষাও দিচ্ছে।


তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, মুসলমান যখন নিরেট জিহাদে লিপ্ত হয় তখন অসম্ভব হয় তাদের পরাজয়। এবং অনিবার্য হয় বিজয়। কারণ, তাদের পক্ষ নেয় মহাশক্তিশালী মহান আল্লাহ। তাঁর ফেরেশতাগণ তখন তাদের সাহায্যে মর্তে নেমে আসে। আর এটিই তো ঈমানদারের মৌল বিশ্বাস। ফলে আফগান মোজাহিদদের পরাজয় যেমন রাশিয়ার ১০ বছরের যুদ্ধে হয়নি, তেমনি হচ্ছে না মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টি কাফের রাষ্ট্রের সম্মিলিত হামলাতেও। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেমন জিতেছে, তারা জিতছে মার্কিন নেতৃতাধীন সম্মিলিত কাফের বাহিনীর বিরুদ্ধেও। আর মুসলানদের জন্য শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মূলতঃ এখানেই। সেটি হলো, আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মুসলমানদের জন্য কোন কল্যাণ আনে না। বিজয় বা গৌরবও বাড়ায় না। বরং যা আনে তা হলো পরাজয় ও অপমান। আর বিদ্রোহের মাত্রার সাথে অপমানের মাত্রাও। মুজিব আমলে বাংলাদেশ তাই পরিণত হয়েছে “বটমলেস বাস্কেট” বা ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি। কোন দেশের জন্য এরচেয়ে অপমানজনক কোন খেতাব কি আর থাকতে পারে? তবে এমন ইজ্জতহানীর ইসলাম-সম্মত একটি ব্যাখাও রয়েছে। সমস্ত ইজ্জতের মালিক তো আল্লাহ। কোরআনে বলা হয়েছেঃ ইজ্জত একমাত্র আল্লাহ, তার রাসূল ও মোমেনদের জন্য। ফলে যারা আল্লাহর দ্বীনের অপমান ও পরাজয় বাড়ায় তারা নিজেরা কি কখনও সম্মানী হতে পারে? আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে যত বিদ্রোহ এ আমলটিতে হয়েছে তা বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমনের পর থেকে এ অবধি কোন কালেই হয়নি। মুজিব-আমলে রেডিও-টিভি ও সভাসমিতিতে তখন পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াতও বন্ধ করা হয়েছিল। মুছে ফেলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ইসলাম ও মনোগ্রাম থেকে কোরআনের আয়াত। বন্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ পাঠ। ইসলাম বিলুপ্ত করার ফলে নজরুল ইসলাম কলেজ পরিনত হয়েছে নজরুল কলেজে। `ইকরা বিসমে রাব্বীকাল্লাযী খালাক’ বিলুপ্ত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে। মুসলমানের কাজ তো আল্লাহর আয়াত ও ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়ানো, নির্মূল করা নয়। অথচ বাংলাদেশে নির্মূলের সে কাজটিই বেশী হয়েছে। মুসলমানের রাজস্বের অর্থে যত্র তত্র বসানো হয়েছে মু্র্তি, গড়া হয়েছে ফুল-চড়ানোর বেদী। দেশটিতে এভাবে চর্চা বাড়ানো হয়েছে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। আর যতই বেড়েছে এ বিদ্রোহ, ততই বৃদ্ধি পেয়েছে দেশের ইজ্জতহীন অবস্থা। ইজ্জত ডুবতে ডুবতে দেশটি দৃর্বৃত্তিতে বিশ্বে পাঁচ বার প্রথমও হয়েছে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় বেইজ্জতি আর কি হতে পারে?


তবে সমস্যা হলো, ইজ্জতডুবির সাথে ডুবে লজ্জা-শরমের অনুভূতিটাও। ফলে ইজ্জত ডুবলেও তখন সেটিকে আর লজ্জাজনক মনে হয় না। মহল্লার দুর্বৃত্ত লম্পটগুলো তো একারনেই রাস্তায় বুক ফুলিয়ে চলে। শির উচিয়ে জনতার মাঝে যায়, অট্রহাসীও দেয়। দেশটির হাজারো বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশকে যারা সবচেয়ে লজ্জাজনক স্থানে পৌঁছালো তাদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলা হচ্ছে তো চেতনাগত এ বিপর্যের কারণেই। তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি শুধু বাংলাদেশের একার বিষয় নয়। সে বিদ্রোহ ছেয়ে গেছে মুসলিম বিশ্বের অন্যসব দেশেও। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে মুসলিম বিশ্বে যেটি বেড়েছে সেটি হলো জাতিয়তাবাদ, বর্ণবাদ, রাজতন্ত্র, পূঁজিবাদ ও স্বৈরাচারের ন্যায় কুফরি ধ্যান-ধারণার প্রতিষ্ঠা। বেড়েছে চুরি-ডাকাতি, সূদ, ঘুষ, মদ্যপান ও পতিতাবৃত্তি। বেড়েছে জ্বিনা, হত্যা, নারীপাচার, পুঁজিপাচার ও সন্ত্রাস। একই কারণে এক সময় বিপুল আবাদ বেড়েছিল সমাজতন্ত্রের ন্যায় বিষাক্ত মতবাদের। লক্ষণীয় হলো, মুসলিম বিশ্বে যতই বাড়ছে আল্লাহর বিরুদ্ধে এরূপ অবাধ্যতা, ততই বাড়ছে মুসলমানদের পরাজয়, অপমান ও পরনির্ভরশীলতা। ৪০ লাখ ইহুদীর কাছে ২৫ কোটি আরব অসহায় তো একারণেই। তবে সে সাথে প্রকট ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষাও। আর তা হলো, যখনই বাড়ছে আল্লাহর হুকুমের প্রতি আনুগত্য, তখন বিজয়ও বাড়ছে। ক্ষুদ্র বাহিনী বিজয় ছিনিয়ে এনেছে বিশাল শত্রু-বাহিনীর বিরুদ্ধে। এবং সেটি যে কেবল সাহাবায়ে কেরামের আমলে হয়েছে তা নয়, এ আমলেও হচ্ছে। বিজয় যে শুধু তালেবানরা আনছে সেটিও নয়। ইসরাইলী হামলাকে সফল ভাবে প্রতিহত করেছে হিজবুল্লাহ। ইতিহাসের বর্বরতম হামলার মুখে এখনও বীরদর্পে বেঁচে আছে হামাস। অথচ ১৯৬৭ সালে ইসরাইলী হামলার মুখে সাতদিনও টিকতে পারিনি মিশর, জর্দান ও সিরিয়ার সম্মিলিত সামরিক বাহিনী। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কি এমনটি সম্ভব? কথা হলো, এতসব দেখেও মুসলমানদের চোখ খুলবে কি? বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার পথ ছেড়ে ফিরবে কি তারা আত্মসমর্পণে?


Bookmark this,
 
Banner